সারের তীব্র সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। চাদঁপুরের উত্তর মতলব উপজেলা ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। যেখানে গত তিন মাসে টিএসপি সারের প্রয়োজন ছিলো ১ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন, সেখানে পাওয়া গেছে ৩৩৫ মেট্রিক টন। যার ফলে কৃষকরা জমি পতিত রাখতে বদ্ধ হয়েছেন। খালি পড়ে থাকা সেই মাঠে এই শীতে নানা ধরণের সবজির আবাদের কথা ছিল কৃষকের। কিন্তু সেই মাঠজুড়ে এখন বিকেল নামতেই খেলতে নামে গ্রামের তরুণ-কিশোররা। খালি মাঠে গোবরসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র রোদে শুকাতে দেন স্থানীয়রা। আর কিছু কিছু এলাকায় একরের পর একর জমি শূন্য পড়ে আছে। দূর থেকে এসব জমি দেখে মনে হতে পারে ধূ ধূ মরুভূমি।
সম্প্রতি সময়ে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। সেখানকার কৃষকরা জানিয়েছেন, সারের অভাবে এখানে সরিষা, ভুট্টা, শীতকালীন নানা জাতের সবজি ও আলু চাষাবাদে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। এতে তাদের চোখে মুখে দেখা গেছে আতঙ্ক ও হতাশার ছাপ। মূলত পর্যাপ্ত সারের অভাবেই এসব জমিতে ফসল চাষ হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের এই দাবির প্রভাব পড়েছে জেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যানে। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এই উপজেলায় চলতি বছরের অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ১ হাজার ৭৫২ মেট্রিকটন ট্রিপল সুপার ফসফরাস (টিএসপি) সারের চাহিদা থাকলেও সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ৩৩৫ মেট্রিক টন।
চরম এই সার সংকটের কারণে এ উপজেলায় ৬ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে শীত মৌসুমের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু টিএসপি সারের অভাবে কৃষক আবাদ করতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ হেক্টর। সেই হিসেব অনুযায়ী, উপজেলায় এ শীত মৌসুমেই ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিই আবাদ সম্ভব হয়নি।
গত তিন মাসে এ উপজেলায় ১ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন টিএসপি সারের চাহিদা থাকলেও সরকার এখানে বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ৩৩৫ মেট্রিকটন। ফলে টিএসপি সারের অভাবে এ উপজেলায় ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে চাষ হয়েছে মাত্র ৩০০ হেক্টর জমিতে।
উপজেলায় ২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে চাষ হয়েছে মাত্র সাড়ে ৪০০ হেক্টর, এক হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে শীতকালীন নানা জাতের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চাষ হয়েছে মাত্র পৌনে ৫০০ হেক্টর জমিতে। ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তীব্র সার সংকটের কারণে এ পর্যন্ত ২০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।


চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম
উপজেলার সারের ডিলার এস আর এন্টারপ্রাইজ, মামুন এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকজন সারের ডিলারের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অক্টোবর মাসে তারা টিএসপি সার পেয়েছেন ৩ থেকে ৫ বস্তা, নভেম্বর মাসে তারা সার পেয়েছেন ১২ থেকে ১৫ বস্তা আর ডিসেম্বর মাসে তারা টিএসপি সার পেয়েছেন ১৮ থেকে ২২ বস্তা। তারা যে পরিমাণ টিএসপি সার পেয়েছেন তা কৃষকের একদিনের বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়নি।
উপজেলা সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, শীতকালীন সবজি, ভুট্টা, সরিষা আর আলু রোপন উপযোগী সময় সাধারণত অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। আর আলু রোপনের সময় এখন একেবারেই শেষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক কৃষিবিদ আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল জানান, জমিতে ভালো ফলন পেতে হলে সুষম সারের প্রয়োজন। মতলবের ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে এখানকার মাটির উর্বর শক্তি এমনিতেই অনেক কমে গেছে। তাই টিএসপি সার বাদ দিয়ে এখানে ভালো উৎপাদন আশা করা সম্ভব নয়।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না
উপজেলার ওটারচর এলাকার কৃষক ও একজন কৃষি উদ্যোক্তা আতাউর রহমান সরকার জানায়, তিনি গত মৌসুমে আড়াই একর জমিতে নানা জাতের শবজি চাষ করলেও চরম সার সংকটের কারণে এবার শবজি চাষ করেতে পেরেছে মাত্র পৌনে ১ একর জমিতে। আর গত বছরে ২ একর জমিতে ভুট্টা আবাদ করলেও তীব্র সার সংকটে এবার ভুট্টার আবাদ করতে পেরেছেন খুবই সামান্য জমিতে।
দেওয়ানজিকান্দি এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, গত বছরে ২ একর জমিতে সরিষার আবাদ করেছিলাম। এবার টিএসপি সারের অভাবে এবার শুধুমাত্র পৌনে ১ একরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ করতে পারিনি।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, চরম সার সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু সার ব্যবসায়ী ১ হাজার ৩৫০ টাকা বস্তার (৫০ কেজি) টিএসপি সার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছে। আর টিএসপি এই চওড়া মূল্য নিয়ে কোনো কৃষক প্রতিবাদ করলে, সার না পেয়ে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
চাহিদার তুলনায় সার বরাদ্দ না পাওয়া এবং লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে চাষ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মতলব উত্তর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী। তবে টিএসপি সারের চাহিদা ও প্রাপ্তির এই পরিসংখ্যান স্বীকার করলেও তার দাবি, উপজেলায় টিএসপি সারের কোনো সংকট নেই। পাশাপাশি এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।



