Spread the love

 

নওগাঁর আত্রাই, মান্দা, পত্নীতলা, সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এখন খেজুর গাছ ‘তোলার’ ধুম লেগেছে। বছরজুড়ে অযত্নে পড়ে থাকা গাছগুলো এখন গাছিদের পরম বন্ধু। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস থেকেই শুরু হয় গাছ পরিষ্কারের কাজ। গাছের ডাল কেটে মাথা চেঁছে কয়েক দিন শুকানো হয়।

ভোরের কুয়াশায় ভেজা ঘাসের ডগা থেকে মেঠোপথের আইল জানান দিচ্ছে শীত এসেছে। নওগাঁর গ্রামীণ জনপদে কুয়াশার চাদর মোড়ানো ভোরে গাছিদের ব্যস্ততা, কোমরে রশি আর হাতে ধারালো দা–সব মিলিয়ে এ যেন এক চিরায়ত বাংলার রূপছবি। অবহেলিত খেজুর গাছগুলো এখন হয়ে উঠেছে রুপালি রসের উৎস আর গাছিদের সোনালি স্বপ্নের সারথি।

গাছের ওপরের দিকে বিশেষ কায়দায় ‘চোখ’ কেটে বাঁশের নলি বসানো হয়। সেখান থেকেই টুপটুপ শব্দে ঝরে পড়ে কাঙ্ক্ষিত রস, যা ভোরের শিশিরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমা হয় মাটির হাঁড়িতে।


এই মৌসুমটি স্থানীয় গাছিদের জন্য আয়ের প্রধান উৎস। আত্রাইয়ের সাহাগোলা এলাকায় নাটোর থেকে আসা অভিজ্ঞ গাছি আব্দুল আজিজ জানান, ২৫ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। শতাধিক গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন। অন্য এক গাছি আব্দুল খালেক জানান, তিনি এবার ৪০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করবেন। একটি গাছ থেকে দৈনিক প্রায় ৪ কেজি রস পাওয়া যায়। ৬ কেজি রস জাল দিয়ে তৈরি হয় ১ কেজি খাঁটি গুড়। মৌসুমে গুড় বিক্রি করে মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

মিষ্টি রসের সুবাস থাকলেও এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। নতুন প্রজন্মের তরুণরা এই পরিশ্রমী পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। অভিজ্ঞ গাছিদের বয়স হয়েছে। সংগত কারণেই কমছে গাছির সংখ্যা। এ ছাড়া ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ কাটা এবং নতুন গাছ না লাগানোর ফলে গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।


মান্দার গণেশপুর গ্রামের গাছি আক্কাস আলী জানান, ‘আগে ১০০ গাছ কাটতেন, এখন ৫০-৬০টিতে নেমে এসেছে। গাছ কমছে, গাছিও হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ আর এই পেশায় আসে না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, খেজুরের গুড় শুধু খাবারের অনুষঙ্গ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। এক সময় জেলায় ৫০ হেক্টর জুড়ে ছিল খেজুর বাগান। বর্তমানে আনুমানিক ৪৫ হেক্টরে এ গাছ রয়েছে। অতিরিক্ত উপপরিচালক খলিলুর রহমান বলেন, ‘এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে পরিকল্পিতভাবে রাস্তার ধারে ও বাড়ির পাশে নতুন খেজুর চারা রোপণ করা জরুরি।’