Spread the love

 

চৈত্র-বৈশাখের বাংলার ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। মাগনের কুলো হাতে বেরিয়ে পড়েছেন নারীরা। বৃষ্টি না হলে, জমি সিক্ত না হলে বীজ বোনা হবে কীভাবে! আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে বীজ বপন কেবল কৃষিকাজ ছিল না; ছিল এক পবিত্র উৎসব, নিবিড় আধ্যাত্মিক আরাধনা। সময়ের বিবর্তনে, আধুনিক প্রযুক্তির যান্ত্রিকতায় বলতে গেলে হারিয়ে গেছে সেই স্নিগ্ধ আচার, শুচি বা পবিত্রতার আবেগ। অথচ সেই আবেগের মধ্যেই মূলত প্রকৃতি টিকে থাকে। আধুনিক কর্ষণে আর বেশি উৎপাদনের আকাঙ্ক্ষায় আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের দেশি বীজগুলো। হাইব্রিড বীজের ধাক্কায় একপাশে সরাতে সরাতে তাকে অতীতের অতলে ঠেলে দিচ্ছি।

আমাদের পূর্বসূরি মায়েরা অত্যন্ত যত্নে বীজ সংরক্ষণ করতেন। সবচেয়ে পুষ্ট বীজ বেছে নিয়ে রোদে শুকিয়ে কাচের বোতলে পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো দিয়ে মুখ আটকে ঝুলিয়ে রাখতেন পাটের শিকায়। লেপাপোছা গোলাঘরে সারি সারি শোভা পেত ঝোলানো শিকা। মাটির পাত্রে পরম আদরে সাজিয়ে রাখা হতো দেশি ধানের বীজ। কোনোটির গায়ে কালচে আভা, কোনোটি সোনালি, কোনোটি ছোট আর তীব্র সুগন্ধি। এ অমৃতের নাম—সঙ্গাবালা, সুমতি, জলসামারা, চানমতি, আসেফুলে, নলখাগড়ি, কোনায় দোসর, নিলামবরি, লেচা, বিনর, বালাম ও ফুলমতি। এই নামগুলো শুধু ধানের জাত নয়; এগুলো আমাদের কবিতা, আমাদের ঠাকুমার ঝুলির গল্প, আমাদের বেঁচে থাকার আদিম উৎস।

সেখানে আরও থাকত বড় মাটির কালো মটকায় সারা বছরের ধান, শুকনো সেদ্ধ চাল, আতপ চাল। কালিজিরা চালের গন্ধে আমোদিত থাকত গোলাঘর। বলা হতো, পদ্মগোখরো সেই আতপ চালের ঘ্রাণে নেশাসক্ত হলে চালের মটকা পাহারা দিত। এই সব মিথ নিয়েই আমরা বড় হয়েছি। কেউ কেউ তা মনে রেখেছি। অনেকেই ভুলে গেছে। কৃষি সংস্কৃতিতে বীজ ধান ঘর থেকে বের করার আগে বাড়ির আঙিনা গোবর-জল দিয়ে লেপা হতো। ঘরের প্রবীণ নারী বা গৃহিণী আলপনা আঁকতেন ধানের গোলার চারপাশে। বিশ্বাস ছিল, ঘরের লক্ষ্মী যদি শুদ্ধ মনে বীজ তুলে না দেন, তবে সেই বীজ অঙ্কুরিত হবে না। বীজের পাত্রে রাখা হতো তুলসী পাতা, কাঁচা হলুদ আর সামান্য দুর্বা ঘাস। যা ছিল দীর্ঘায়ু ও শুচিতার প্রতীক।

অনাবৃষ্টির দিনে যখন মাটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত, তখন বীজ ফেলার আগে কুমারী মেয়েরা কুলা হাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গেয়ে ‘মেঘারানী’র কাছে জল মাগত। উত্তরবঙ্গে প্রচলিত ছিল ‘হুদমা দ্যাও’ এর পুজো, যেখানে প্রকৃতির কাছে অহংকার বিসর্জন দিয়ে বৃষ্টির আকুতি জানানো হতো। পৌষ সংক্রান্তি বা পয়লা বৈশাখের ভোরে ধানের শিষ বা খড় দিয়ে বিশেষ বিনুনি বা ‘বাউনী’ বেঁধে দেওয়া হতো ক্ষেতের কোণে, যেন ঘরের প্রাচুর্য কখনো ছেড়ে না যায়।

ষাটের দশকের ‘সবুজ বিপ্লব’ বদলে দিল পুরো দৃশ্যপট। উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার আর বিষাক্ত কীটনাশকের আগ্রাসনে আদি ও অকৃত্রিম দেশি বীজ কৃষকের ঘর থেকে চলে গেল বহুজাতিক কোম্পানির ল্যাবরেটরিতে। কৃষক হারিয়ে ফেলল তার বীজের স্বাধীনতা। যে কৃষক একসময় নিজেই ছিলেন বীজের উদ্ভাবক ও সংরক্ষক, তিনি আজ পরিণত হয়েছেন কোম্পানির ক্রেতায়। আমাদের মাটি হয়ে পড়ল রাসায়নিকে আসক্ত এক বন্দিনী। আর ধানের চিরচেনা নামগুলো ধীরে ধীরে রূপকথা হয়ে হারিয়ে যেতে বসল।

হাইব্রিড বা জিএমও (GMO) বীজ থেকে কৃষক পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন না। প্রতিবার তাকে নতুন করে বীজ কিনতে হয় বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে। এটি কেবল কৃষকের পকেট কাটে না, বরং আমাদের সামগ্রিক কৃষিব্যবস্থাকে এক চরম পরনির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তবে সব শেষ হয়ে যায়নি। ছাইচাপা আগুনের মতোই আমাদের শিকড়ের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে স্বপ্নবাজ মানুষরা গড়ে তুলেছেন খামার। সেখানে একহাতে রয়েছে হাজার বছরের চেনা আদিম মাটি, আর অন্য হাতে বহুজাতিক করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধের বারুদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্বের তরুণ শিক্ষার্থী আর মাঠের রোদে পুড়ে কালো হওয়া প্রান্তিক কৃষক আজ সেখানে সহযোদ্ধা। তাদের পরিচয় একটাই—তারা ‘বীজ বাঁচানোর মানুষ’।

আজকের এই করপোরেট যুগে নিজেদের দেশি বীজ রক্ষা করতে না পারলে আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব (Food Sovereignty) চিরতরে বিপন্ন হবে। খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) মানে কেবল পেট ভরানো, যা আমদানিকৃত বা কোম্পানির বীজ দিয়েও সম্ভব। কিন্তু খাদ্য সার্বভৌমত্ব হলো—আমরা কী উৎপাদন করব, কীভাবে করব এবং কোন বীজ দিয়ে করব, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন অধিকার।

যখন একটি দেশের বীজের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় গুটিকয়েক বহুজাতিক করপোরেট ল্যাবরেটরির হাতে, তখন সেই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এক অদৃশ্য সুতোয় বন্দি হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই মহা-সংকটের যুগে হাইব্রিড বীজ সামান্য খরা বা বন্যায় ধসে পড়ে। আর আমাদের শত শত বছরের অভিযোজিত দেশি জাতগুলো প্রাকৃতিকভাবেই দুর্যোগসহনশীল।

দেশি বীজ রক্ষা করা কোনো রোমান্টিক অতীত-বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের টিকে থাকার আদি ও অকৃত্রিম লড়াই। মাটির সোঁদা গন্ধ আর কৃষকের বীজের স্বাধীনতাই পারে একটি দেশের মেরুদণ্ডকে সোজা করে রাখতে। যদি আমরা আমাদের সুমতি, জলসামারা কিংবা বালামকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারি, তবে একদিন আমাদের থালায় যে অন্ন উঠবে, তার স্বাদ হবে যান্ত্রিক আর তার পেছনে থাকবে দাসত্বের দীর্ঘশ্বাস। বীজ বাঁচানোর এই লড়াইয়ে শামিল হতে হবে আমাদের সবাইকে—মাটি ও মানুষের মুক্তির স্বার্থেই।

শাঁওলী সুমন