Spread the love

 

ছোটবেলায়, এই ধরুন বেলা এগারোটা-বারোটার দিকে বাড়ির বড়রা আমাদের হাতে লবণ দিয়ে এক টুকরো লেবু ধরিয়ে দিতেন। আমরা লেবু চেটে চেটে খেতাম আর রোদের মধ্যে দৌড়াতাম। আমাদের সর্দি-গর্মি হতো না। একটু হলুদ, একটু তেতো, একটা লেবু খাওয়া, এক টুকরো পাকা পেঁপে—এই তো ছিল গরমের দুপুরে বাড়তি খাওয়া। আর ঘামে ভিজে বাড়ি ফিরলেই হাতে চলে আসত এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত। এখন যে গরমের ভাদ্র পার করছি ,তাতে করে ঠান্ডা লেবুর সরবতের কথা আরো বেশি মনে পড়ছে ।

শৈশবের সেই সহজসরল অভ্যাসের নেপথ্যে ছিল গভীর এক স্বাস্থ্যজ্ঞান। আমাদের বড়রা জানতেন, প্রখর গরমে শরীরকে তাজা ও রোগমুক্ত রাখতে লেবুর বিকল্প নেই। বর্তমানের আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও ঠিক এই কথাই বলছে।লেবু হলো ভিটামিন সিএর অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক উৎস। ভিটামিন সি আমাদের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বাড়িয়ে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে সর্দি, কাশি, জ্বর কিংবা যেকোনো সংক্রামক ব্যাধি থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত লেবু খাওয়া অত্যন্ত কার্যকর।

তীব্র গরমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইটস ঘামের সঙ্গে বের হয়ে যায়। এর ফলে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। গরমে এক গ্লাস লেবুর শরবত মুহূর্তেই শরীরে পানির সমতা ফিরিয়ে আনে, ক্লান্তি দূর করে এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।ভুল খাদ্যাভ্যাস ও দূষণের কারণে আমাদের শরীরে যে নানা ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ বা টক্সিন জমা হয়—লেবুর রসের সাইট্রিক অ্যাসিড সেখানে প্রাকৃতিক ‘ডিটক্সিফায়ার’ হিসেবে কাজ করে। এটি যকৃৎ ও রক্তের দূষিত পদার্থ বের করে দিয়ে শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার ও সতেজ রাখে।

আসলে লেবুর গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অনেকের শরীরেই পুষ্টিকর খাবার খাওয়া সত্ত্বেও আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়; কারণ শরীর খাবার থেকে ঠিকমতো আয়রন শোষণ করতে পারে না।লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড ও ভিটামিন সি উদ্ভিদজাত খাবার থেকে রক্তে আয়রন শোষণের মাত্রা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বজায় থাকে এবং রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমে।

দুপুরের ভারী খাবারের সঙ্গে এক টুকরো লেবুর রস মিশিয়ে নিলে তা হজমে বিশেষ সাহায্য করে। লেবুর রস পাচক রস নিঃসরণে উদ্দীপনা জোগায়, ফলে গ্যাস, অম্বল বা পেটের গণ্ডগোল দূর হয়। সকালে হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, লেবুর উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্ল্যাভোনয়েড রক্তের কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ফলে নিয়মিত লেবু খেলে ধমনী পরিষ্কার থাকে এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড কিডনিতে ক্যালসিয়াম অক্সালেট জমা হতে বাধা দেয়, যা মূলত কিডনিতে পাথর তৈরির প্রধান কারণ। এটি মূত্রের পিএইচ (pH) মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

সৌন্দর্যসচেতন ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য লেবু হতে পারে প্রাকৃতিক ওষুধ। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনের ডায়েটে লেবু অত্যন্ত দরকারি ভূমিকা পালন করে। এটি মেটাবলিজম বা বিপাকহার বাড়িয়ে মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি লেবুর ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে ভেতর থেকে সুস্থ রাখে, বলিরেখা দূর করে এবং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে।

শৈশবে নুন-লেবু চেটে খাওয়ার যে আনন্দময় দিনগুলো ছিল, তা-ই ছিল সুস্থ থাকার সহজ পাঠ। প্রক্রিয়াজাত পানীয় আর কৃত্রিম এনার্জি ড্রিংকের ভিড়ে আমরা যখন নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত, তখন প্রকৃতির এই সহজ ও সাশ্রয়ী উপাদানটিই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। তাই শরীরকে চাঙ্গা রাখতে ও বড় বড় অসুখ থেকে মুক্ত থাকতে প্রতিদিনের খাবার টেবিলে অন্তত এক টুকরো তাজা লেবু রাখা অত্যন্ত জরুরি।

শাওঁলি সুমন