
একজনের খাবারে চালকুমড়োর স্যূপ। অন্য জনের মোরিঙ্গা রুটি! বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যাঁদের সিদ্ধান্ত বদলে দেয় সমীকরণ , তাঁদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে ঠিক কী থাকে? উত্তরটা শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন। বিলাসবহুল ভোজ আর হাজার রকম বাহারি পদের বদলে তাঁদের পাতে শোভা পায় অতি সাধারণ চালকুমড়োর স্যুপ আর সজনে পাতার পরোটা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী- ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে বসেও নিজেদের খাদ্যতালিকায় ধরে রেখেছেন অদ্ভুত এক সহজ-সরল জীবনধারা। এই সাদামাটা খাবারই কি তাঁদের রাজনীতি আর কূটনীতির জটিল দাবার চাল চালতে সাহায্য করে? দুই দেশের দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক শি জিং পিং এবং নরেন্দ্র মোদীর খাদ্য তালিকায় যা থাকে, তা কি আসলেই আমাদের খাবারে যোগ করা সম্ভব?

আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে পেট শুধু খাবার থেকে প্রসেস করে সমস্ত শরীরে পাঠায় না, চিন্তাও করতে পারে। এজন্য পেটকে দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয।আমাদের মেজাজ কেমন থাকবে, আমরা কতটা মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারব, কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের মাথা কতটা ঠাণ্ডা থাকবে- তার অনেকটা নির্ভর করে আমরা পেটে কী ঢালছি তার ওপর। খেয়াল করলেই দেখবেন, মন খারাপ থাকলে আমরা এক ধরনের খাবার খাই, আবার মন ভালো করার জন্য অন্য এক ধরণের খাবার খেতে পরামর্শ দেন বিষেশজ্ঞরা। মানে খাবারই সব। আপনি কি খাচ্ছেন মানে, আপনি তাই হয়ে উঠছেন। পাত নিয়ে আলোচনার পাততারি না গুটিয়ে আরেকটু বাড়াই চলুন। বিশ্বমঞ্চের এই দুই পরাক্রমশালী নেতার খাবারের থালা নিয়ে একটু গভীরভাবে নজর দেওয়া যাক।

প্রথমেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রসুইঘরের খবর। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সকালের খাবার বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জমকালো কোনো আয়োজন। কিন্তু মোদীজির সকালটা শুরু হয় একেবারেই সাধারণ পোহা অর্থাৎ চিঁড়ে ভাজা কিংবা উপমা দিয়ে। সঙ্গে থাকে তাজা মরসুমি ফল আর শাকসবজি। দুপুর বা রাতের খাবারেও কোনো জটিল বিদেশি পদের অস্তিত্ব নেই। সাধারণ ডাল, ভাত, রুটি আর হালকা মসলার নিরামিষ তরকারিতেই তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
তবে তাঁর খাবারের তালিকায় দুটি পদ বিশেষভাবে নজর কাড়ে- মাখনা এবং সজনে পাতার পরোটা। বছরে তিনি বেশিরভাগ দিনই হালকা খাবার হিসেবে মাখনা খান। আর সপ্তাহের কয়েক দিন তাঁর পাতে থাকে পুষ্টিতে ভরা সজনে পাতার পরোটা। একসময় তিনি নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে এই পরোটা বানাতেন। এ ছাড়া হালকা আর সহজে হজম হয় বলে খিচুড়িও তাঁর খুব পছন্দের। তিনি কখন খাচ্ছেন তার চেয়েও বড় কথা তিনি কতটা মেপে খাচ্ছেন। প্রাচীন ভারতীয় নিয়ম মেনে তিনি প্রায়ই কঠোর উপবাস করেন, বিশেষ করে নবরাত্রির নয় দিন। রাষ্ট্রীয় কাজের চরম ব্যস্ততা বা বিদেশ সফরের মধ্যেও তিনি এই কঠোর নিয়ম মেনে চলেন।
অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং- বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশের প্রধান হয়েও তিনি বিদেশে গিয়ে বিলাসবহুল খাবার এড়িয়ে চলেন। ৭৩ বছর বয়সী এই নেতা যখন রাশিয়া, যুক্তরাজ্য বা ভারতে সফর করেন, তখন তাঁর খাবারের প্লেটে থাকে খাঁটি চীনা ঘরোয়া রান্নার স্পর্শ। তিনি অতিরিক্ত খাওয়া একদম পছন্দ করেন না। আন্তর্জাতিক সফরের দিনগুলোতে মদ বা যেকোনো অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় তিনি সম্পূর্ণ বাদ দেন।
শি জিনপিংয়ের খাবারের টেবিলে সাধারণ সাদা ভাত, সঙ্গে হালকা ঝোল বা স্ট্যু, কম তেলে সাঁতলানো শাকসবজি, ধীর আঁচে সেদ্ধ করা মুরগির মাংস এবং চীনা ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ ডাম্পলিং থাকে। আর সবচেয়ে বিখ্যাত পদটি হলো তাঁদের ঐতিহ্যবাহী চালকুমড়োর স্যুপ। বিশ্ব রাজনীতির তীব্র চাপ আর কঠিন মানসিক অবস্থায় এই সাধারণ ঘরোয়া খাবারই তাঁকে সতেজ রাখে। তবে নিজের দেশের চেনা স্বাদের পাশাপাশি তিনি বিদেশের স্থানীয় খাবার চেখে দেখতেও বেশ ভালোবাসেন। যুক্তরাজ্যে গিয়ে সাধারণ রেস্তোরাঁয় বসে ফিশ অ্যান্ড চিফ্স খাওয়া কিংবা রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে নিজে হাতে ‘ব্লিনি’ নামের প্যানকেক তৈরি করার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে বেশ সাড়া ফেলেছিল।
এখন কথা হলো, এই খাবারগুলো কি আমাদের প্রতিদিনের তালিকায় রাখা সম্ভব? সত্যি বলতে, মোদীজি বা শি জিনপিং যে খাবারগুলো খান, সেগুলো কোনো মহামূল্যবান বা বিরল পদ নয়। সজনে পাতা, চালকুমড়ো, চিঁড়ে, ডাল, ভাত কিংবা সাধারণ সবজি- এগুলো আমাদের হাতের কাছেই খুব সহজে আর কম খরচে পাওয়া যায়। মাখনাও আজকাল যেকোনো বাজারে কেনা যায়। তাই সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের পক্ষে এই খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা একেবারেই কঠিন কিছু নয়।
শরীর ও মনকে শান্ত রাখার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই সহজপাচ্য খাবারে। ভারী, মসলাদার এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের শরীরকে ক্লান্ত করে তোলে এবং ব্রেনের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কিন্তু সজনে পাতা বা চালকুমড়োর মতো প্রাকৃতিক পুষ্টিতে ভরা হালকা খাবার শরীরকে ঝরঝরে রাখে এবং ব্রেনকে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।আপনি আমি রাষ্ট্রনেতা না হতে পারি তবে সুস্থ থাকার জন্য এই শাকসবজি খেতে তো পারিই তাই না!
শাঁওলী সুমন




