
বড় ভাই চলনবিলের ছোটভাই গাজনার বিল, দেশের বৈচিত্র্যময় কৃষি পরিবেশ বিবেচনায় এক অনন্য সমৃদ্ধ জনপদ।আর এই গাজনার বিলের জল ছুয়ে যে সুজানগর , তাকেই বলা হয় ‘পেঁয়াজের রাজধানী’ । বাংলাদেশের মোট পেঁয়াজের এক-তৃতীয়াংশই উৎপাদিত হয় গাজনার বিল এলাকায়।
প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই গাজনার বিল এলাকা বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময় জুড়েই থাকে জলে ডুবে, যখন জমি উকিঁ দেয় , তখন এলাকার চাষীরা নেমে পড়ে নরম মাটির ক্ষেতে । নিজেদের বছরের খরচ যোগাড়ে তারা মূলত চাষ করে পেঁয়াজ। আবহমানকাল থেকে গাজনার বিলের চাষীরা সেখানে পেঁয়াজ চাষ করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে কৃষকের কষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে বর্ষায় ভেসে আসা কচুরিপানা । কারন বর্ষা বিদায় নেয় কিন্তু জমে থাকে কচুরিপানা । আর তার সঙ্গদোষে জন্ম নেয় অন্যান্য আগাছা । যা পরিস্কার করাও এক দুরূহ কাজ। এখন নতুন পেয়াঁজ উঠছে তাই কৃষকরা একটু স্বস্থিতে আছেন , কথা বলতে দ্বিধা নেই কিন্তু আগাছার আলোচনায় মুখ কালো হয়ে যায় ।

এক বিঘা জমিতে আগাছা পরিস্কার করতে যে প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা খরচা হয় ,সেটাই এক বাড়তি ব্যয় । শুধু শরীরের খাটুনিতে সেই আগাছা আর পরিস্কার কষ্টের কাজ । তাই তারা উপায়হীন হয়ে এখন ব্যবহার করছেন বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানীর আগাছানাশক বিষ। নিজেদের পরিবার পোষনটাই প্রধান, তাইতো মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ও পরিবেশ এর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর আগাছানাশক নিয়ে ভাববার অবকাশ কম । বরং কখনও ওষুধ কোম্পানির শাট-প্যান্ট পরিহিত স্মাট এজেন্টরা বোঝায় গ্লাইফোসেট ও প্যারাকুয়েট গোত্রের আগাছানাশক ব্যবহারের “ সুফল “ । মাত্র কয়েকশত টাকা দিয়েই এক বিঘা জমির আগাছা বিনাশ হয়ে যায় , ক্যালেকুলেটার ছাড়াই সেই হিসেব করে ফেলতে পারে শিক্ষার ছোয়া না পাওয়া কৃষক । রাজী হয়ে যান লাভের কথা আর নিজের কষ্টের কথা ভেবে, এখনতো আবার মজুর বা কামলা নিলেও দৈনিক খরচও কম নয় !
কিন্তু পরিবেশ এর ক্ষতি? স্বাস্থ্যের ক্ষতি? এই প্রশ্নে কৃষক চুপ করে তাকায় মাটির দিকেই । তারা জানেও না সেই আগাঝানাশক কতখানি ক্ষতিকর। কেউ তাদেরকে বলেনি এই আগাছানাশক নামের বিষ ব্যবহারে মাটির অণুজীব কিভাবে ধ্বংস হয়। কিভাবে বাতাসের সাথে মিশে তা কৃষকের শরীরে প্রবেশ করে কিভাবে তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। যেহেতু কৃষক এসব ক্ষতি সম্পর্কে কিছু জানে না, তাই শুধু গাজনার বিল এলাকাতেই নয়, সারাদেশেই আগাছানাশক বিষ এর ব্যবহার মারাত্মকভারে বেড়ে চলেছে। অথচ সবাই যেন কেমন নীরব, কেমন যেন মুখে কলুপ এঁটে রেখেছেন। ভবিষ্যতের ধ্বংস ঠেকাতে কোথায় আমাদের কৃষি দপ্তর, কোথায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তৎপরতা?
কি করা উচিত? এই প্রশ্নে সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ক্ষেতে-পাতের প্রতিনিধিকে বলেন, তারা কৃষকদেরকে যতটুকু সম্ভব আগাছানাশক কম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর বাইরে তাদের কিছু করার নেই। তবে তিনি মনে করেন, এ ব্যাপারে আমাদের কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। কৃষককে সহজলভ্য ও টেকসই উপায় না জানাতে পারলে এই আগাছানাশক নামের বিষ ব্যবহার ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। কৃষিখাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি সরকারের একটি অন্যতম অঙ্গীকার। তাই গাজনার বিল এলাকায় কচুরিপানা কাটার মত ভাসমান ট্রিমার এর ব্যবহার বৃদ্ধি কিছুটা ফল দিতে পারে। তবে সবার আগে কৃষকদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে হবে। জানাতে হবে তাদের নিজের শরীর আর মাটির স্বাস্থ্যেহানির বিষয়টিও।
গাজনার বিল এক সময়ে ধান, মাছ, মাংস, দুধ, দই, ঘি, ডাল, রাই, সরিষার উৎস ছিল। এখন বন্যা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাপনার ফলে সব হারিয়ে ভরসা দাড়িয়েছেমুলত পেয়াজ আর সাথে বোরো ধান বা পাট । মাছ প্রায় নাই, যদিও এখন পুকুরে তা কিছুটা স্থান পেয়েছে। জমিওয়ালা কৃষকের অর্থনৈতিক উপকার হয়েছে। কিনতু খাবারের তালিকায় বিশেষ করে দরিদ্র কৃষকের পাতে শর্করা ঠিকমতো জুঠছে না। যারা মাছ ধরে খায় , তাদেরও নিয়মিত মাছ জোটে না পাতে, চাল-তেলের দামটাইতো বেশি । আর যে গাজনার বিলের প্রধান ফসল পেয়াঁজ , তার দামের ওঠা-নামা , ফড়িয়া-দালালের দৌড়াত্বের সাথে আছে পেয়াঁজ আমদানির সরকারি খেয়ালি সিদ্ধান্ত । কে বলবে চকচকে সোনালী রঙয়ের পেয়াঁজ উৎপাদনকারি চাষীর সুখ-দুঃখের কথা ?




