
আগামীকাল ২৯ সেপ্টেম্বর, খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় সচেতনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক দিবস। একদিকে যখন দেশের কোটি মানুষ পুষ্টিহীনতা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে লড়াই করছে, অন্যদিকে তখন নীরব এক মহড়ায় নষ্ট হচ্ছে উৎপাদিত ও সংগৃহীত লাখ লাখ টন খাবার। মাঠের ফসল ঘরে তোলা থেকে শুরু করে রান্নাঘরের ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ঘটছে অপচয়। ‘আন্তর্জাতিক খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় সচেতনতা দিবস’ উপলক্ষে আজকের এই বিশেষ আয়োজনে আমরা খতিয়ে দেখেছি দেশের খাদ্য অপচয়ের প্রকৃত চিত্র, এর পেছনের লুকানো দুর্বলতা এবং উত্তরণের সুনির্দিষ্ট উপায়।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে খাদ্য অপচয়ের মাত্রা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। মাঠ পর্যায় থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো সাপ্লাই চেইনে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় বা নষ্ট হয়ে থাকে।
শুধু গৃহস্থালি ও ভোজ্য পর্যায়ে বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়।
চালের ক্ষেত্রে ফসল কাটা, মাড়াই, শুকানো, সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যায়ে প্রায় ৮ থেকে ১৫ শতাংশ অপচয় হয়।
ফল ও সবজির ক্ষেত্রে অপচয়ের হার —প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ।
অপচয় রোধ করা গেলে দেশের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষের বার্ষিক পুষ্টি ও খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব
খাদ্য অপচয়ের এই মহোৎসবের পেছনে কাঠামোগত, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক কিছু বড় ত্রুটি কাজ করছে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘরের অভাবে শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের পরপরই নষ্ট হয়ে যায়। সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিপণ্য পরিবহনের ফলে দূরপাল্লার যাতায়াতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়।কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল মাঠেই ফেলে দেন। বিয়ে বা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না করা এবং প্লেটে খাবার নিয়ে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা অপচয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

খাদ্য অপচয় কমিয়ে আনতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত আধুনিক কোল্ড চেইন ও তাপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় অপচয় যাতে না হয় সেদিকটা ভালো করে দেখতে হবে।
হোটেল, রেস্তোরাঁ বা বড় অনুষ্ঠান থেকে উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাবার সংগ্রহ করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে বিতরণ করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যাতে অবশিষ্ট খাদ্য নস্ট হয়ে না যায়। ।ফসল কাটার পরের ক্ষতি (Post-harvest loss) কমাতে আধুনিক হারভেস্টার ও বৈজ্ঞানিক শুকানোর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
“প্লেটে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই নিন” এই স্লোগানটি পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া এবং গণমাধ্যমে প্রচার বাড়ানো। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে খাদ্য অপচয় রোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, উৎপাদিত খাদ্যের সঠিক ব্যবহার ও অপচয় রোধ সমানভাবে জরুরি। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—খাদ্যের একটি কণাও যেন আর অপচয় না হয়। সম্মিলিত সচেতনতাই পারে একটি ক্ষুধামুক্ত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে।




