Spread the love

নদীমাতৃক বাংলাদেশের খাল-বিল ও জলাশয়ে কচুরিপানা এক অতি পরিচিত দৃশ্য। যুগের পর যুগ ধরে কৃষকদের কাছে এটি এক বিরক্তিকর জলজ আগাছা বা অভিশাপ হিসেবেই পরিচিত।  অতিরিক্ত বংশবৃদ্ধির কারণে জলাশয় যখন কচুরিপানায় ঢেকে যায়, তখন পানিতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না। সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হওয়ায় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায়। অন্যদিকে নৌ-চলাচল ও সেচ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি বোরো মৌসুমের শুরুতে জমি পরিষ্কার করতে গিয়ে কৃষকদের হাজার হাজার টাকা কেবল শ্রমিকদের পেছনেই ব্যয় করতে হয়।

Manual removal of water hyacinth worries environmentalists

অথচ, আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে একটু সচেতন পরিকল্পনা থাকলে এই তথাকথিত আবর্জনাকেই কৃষকের পরম বন্ধু বা উন্নতমানের জৈব সারে রূপান্তরিত করা সম্ভব।

কচুরিপানাকে পুড়িয়ে বা ফেলে না দিয়ে পচিয়ে জৈব সারে রূপান্তর করলে কৃষকের অর্থনীতি ও মাটির স্বাস্থ্যে এক জাদুকরী পরিবর্তন আসে। বর্তমান বিশ্বে ইউরিয়া, টিএসপি বা পটাশ সারের দাম যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তখন কচুরিপানা হতে পারে কৃষকের খরচ বাঁচানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এতে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম রয়েছে। রাসায়নিক সারের পুষ্টি পানিতে খুব দ্রুত ধুয়ে গেলেও কচুরিপানার কম্পোস্টের পুষ্টি উপাদানগুলো ধীরগতিতে মাটিতে মেশে। ফলে গাছের শিকড় দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে এবং শিকড় পুড়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না।

শুধু তাই নয়, এই সার মাটিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিস্তার ঘটিয়ে মাটির সার্বিক গঠন উন্নত করে। এটি মাটিতে অনেকটা স্পঞ্জের মতো কাজ করে। ফলে খরার সময় মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে জমিতে সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। একজন কৃষক তার মোট সারের চাহিদার অর্ধেকও যদি এই কম্পোস্ট দিয়ে মেটান, তবে হেক্টরপ্রতি তার হাজার হাজার টাকা সাশ্রয় হবে।
Transforming water hyacinth into eco-friendly products

এই সার তৈরির পদ্ধতিটি কৃষকরা খুব সহজেই নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারেন। এর জন্য প্রথমেই বাড়ির আশপাশে ছায়াযুক্ত ও অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে একটি গর্ত খুঁড়তে হবে। সাধারণত তিন ফুট গভীর এবং চার থেকে পাঁচ ফুট চওড়া একটি গর্তই এর জন্য আদর্শ। তবে জলাশয় থেকে তাজা কচুরিপানা তুলে সরাসরি গর্তে ফেলা যাবে না। কচুরিপানায় প্রায় নব্বই ভাগই পানি থাকে। তাই সংগ্রহ করার পর অন্তত এক থেকে দুই দিন রোদে ছড়িয়ে রেখে এর জলীয় অংশ কিছুটা কমিয়ে নিতে হবে।

জলীয় অংশ কমে এলে গর্তে স্তরে স্তরে উপাদানগুলো সাজাতে হয়। গর্তের একেবারে নিচে দশ থেকে বারো ইঞ্চি পুরু করে শুকানো কচুরিপানা বিছিয়ে দিতে হবে। পচন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এর ঠিক ওপর দুই থেকে তিন ইঞ্চি পুরু করে তাজা গোবর বা গোবর গোলানো পানির প্রলেপ দেওয়া প্রয়োজন। গোবরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া মূলত সার তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে। পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়াতে এবং মিশ্রণের অম্লত্ব বা পিএইচ ঠিক রাখতে সামান্য কাঠের ছাই ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সাথে এক মুঠো ফসলি জমির ওপরের মাটি ছড়িয়ে দিলে অণুজীবের কার্যক্রম খুব দ্রুত শুরু হয়। এভাবে গর্তটি মাটির স্তর থেকে সামান্য উঁচু হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে উপাদানগুলো সাজাতে হবে।

কম্পোস্ট তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর আর্দ্রতা ধরে রাখা। এই আর্দ্রতা যাচাই করার জন্য কৃষকরা খুব সহজেই মুঠো পরীক্ষা বা স্কুইজ টেস্ট করতে পারেন। গর্ত থেকে এক মুঠো মিশ্রণ হাতে নিয়ে শক্ত করে চাপ দিলে যদি আঙুলের ফাঁক দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি বের হয় এবং মিশ্রণটি দলার মতো পেকে থাকে, তবে বুঝতে হবে আর্দ্রতা একদম ঠিক আছে। এটি অনেকটা ভেজানো স্পঞ্জ চিপে ধরার মতো। কিন্তু চাপ দিলে যদি অনবরত পানি ঝরে, তবে বুঝতে হবে বেশি ভিজে গেছে। আর গুঁড়ো হয়ে ভেঙে গেলে বুঝতে হবে মিশ্রণটি অতিরিক্ত শুষ্ক। বাতাস ছাড়া যেহেতু ভালো পচন সম্ভব নয়, তাই প্রতি পনেরো থেকে বিশ দিন পর পর কোদাল দিয়ে পুরো স্তূপটি উল্টেপাল্টে দিতে হবে।

বৃষ্টি বা কড়া রোদের হাত থেকে বাঁচাতে স্তূপটি চট, কলাপাতা বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা জরুরি। কখনো যদি মিশ্রণ থেকে অ্যামোনিয়ার তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়, তবে বুঝতে হবে ভেতরে বাতাস চলাচল করছে না। তখন দ্রুত চট সরিয়ে পুরো মিশ্রণটি উল্টে দিয়ে কিছু শুকনো পাতা বা খড় মিশিয়ে দিতে হবে। আর মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে পরিমাণমতো পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এভাবে সঠিক পরিচর্যা করলে আবহাওয়া ভেদে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই এটি কালচে-বাদামী, গন্ধহীন ও চা-পাতার মতো ঝুরঝুরে উন্নতমানের জৈব সারে পরিণত হবে।

 

কচুরিপানার এই সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু কৃষকেরই লাভ হয় না, বাঁচে আমাদের প্রকৃতিও। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে তা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদী-নালায় পড়ে এবং ক্ষতিকর জলজ আগাছা ও শৈবাল বৃদ্ধি করে। জৈব সার এই দূষণ চক্রকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।

এছাড়া কচুরিপানা পানিতে পচে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরি করে, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। একে কম্পোস্টে পরিণত করার মাধ্যমে মূলত এর ভেতরের কার্বনকে জৈব কার্বন হিসেবে মাটিতে আবদ্ধ করা হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরাসরি ভূমিকা রাখে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যদি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে এই মুঠো পরীক্ষা এবং স্তর বিন্যাস পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেয়, তবে এটি একটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ শিল্পে পরিণত হতে পারে। তরুণ উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিকভাবে জলাশয় থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে বৃহৎ পরিসরে এই সার তৈরি ও প্যাকেটজাত করে বিক্রি করতে পারেন। এটি একদিকে যেমন খাল-বিলকে প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার রাখবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

যে কচুরিপানা এতদিন কৃষকের কপালের চিন্তার ভাঁজ গভীর করত, সামান্য বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার গুণে সেটিই আজ আমাদের মৃতপ্রায় মাটির প্রাণ ফিরিয়ে এনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও উর্বর কৃষিভূমি নিশ্চিত করতে পারে।