
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী যতই বলুক আর স্বয়ং কৃষিমন্ত্রী জাতীয় সংসদে সত্য বলার হলফনামা স্টাইলে বক্তৃতা দিয়ে সার সংকট অস্বীকার করলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। সরকার বলছে সার নিয়ে অস্থিরতার চেষ্টা চলছে কিন্তু রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ,এমনকি আজ সোমবার দ্বিতীয়বারের মত ডিলারের গোডাউন থেকে সার নিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ক্ষেত্রে কৃষকরাই বিক্ষোভে নামছে, পুলিশও বলছে না যে এরা “ দুস্কৃতিকারি “ !

আজ সোমবার একাধিক গনমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সার নিয়ে বিক্ষোভের খবর প্রকাশ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিলারের গোডাউন থেকে সার নিয়ে যাবার ভিডিও ছড়িয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে দেরি হওয়ায় এক ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা সার নিয়ে গেছেন। আজ সোমবার সকালে বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।

ডিলারের দাবি, গুদাম থেকে এক–দেড় শ বস্তা ইউরিয়া সার নেওয়া হয়েছে। তবে সার নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তিনি বলেন, সার লুট হয়ে যাওয়ার ভিডিওটি ভুয়া। বন্দবেড় ইউনিয়নে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রৌমারী উপজেলায় ৪২ হাজার কৃষক আছেন এবং তাঁরা সবাই সঠিকভাবে সার পাচ্ছেন।
গুদামে ৭৫০ বস্তা সার ছিল জানিয়ে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছে, সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে লাইনে দাঁড়ান। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা থানায় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। এ সুযোগে কৃষকেরা গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে এক থেকে দেড় শ বস্তা সার নিয়ে যান। পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা বাকি সার বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান সাইফুল ইসলাম। বিতরণের হিসাব শেষ হলে কত বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী গনমাধ্যমে বলেছেন, সকালে সার বিতরণের সময় পুলিশকে জানানো হয়নি। এ সময় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যান বলে কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
একই দিন ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা। এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা। স্থানীয় একাধিক কৃষক বলেন, আজ বন্দবেড় বাজারে সার বিতরণের কথা ছিল। কৃষকেরা রাত দুইটা থেকে গুদামের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। কিন্তু সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সকাল ৯টা থেকে ১০টার দিকে একপর্যায়ে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সার নিয়ে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার বের করছেন। কেউ মাথায় করে, আবার কেউ ভ্যানে করে বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে নিয়ে যাওয়া সার ফেরত পাওয়া যায়নি।
এদিকে রাজশাহীর বানেশ্বরে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি অভিযোগ ও সারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে কৃষকরা। সোমবার বেলা এগারটা থেকে বারোটা পর্যন্ত রাজশাহী নাটোর মহসড়কে বানেশ্বর বাজারে ঘন্টাব্যাপী এই সড়ক অবরোধ হয়।এতে আশপাশের এলাকার শতাধিক কৃষক অংশ নেন।
কৃষকদের বিক্ষোভে সড়কের দুপাশে যানজট তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীরা বলেন, সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে চাহিদামত সার না পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ফলের মাঠের ফলন ফলাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। সার না পাওয়ায় মাঠের ফসল নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। বেলা বারোটার দিকে পুলিশের অনুরোধে সড়ক ছেড়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন কৃষকরা।
আজ বেলা ১১টার দিকে লালমনিরহাট সদর উপজেলার ফকিরের তকেয়া এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন কৃষকরা। এ সময় তারা সারের কৃত্রিম সংকট নিরসন ও ডিলারদের দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। আকস্মিক এ অবরোধের ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও চালকরা।
বিক্ষুব্ধ কৃষকদের অভিযোগ, চলতি আমন মৌসুমে জমিতে এখনই সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। কিন্তু ডিলার পয়েন্ট কিংবা খুচরা বাজার, কোথাও চাহিদামতো সার মিলছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিয়েও সময়মতো সার না পাওয়ায় ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন তারা। কৃষকদের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং সিন্ডিকেট করে সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা কৃষকদের দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত সার সরবরাহের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিলে প্রায় এক ঘণ্টা পর মহাসড়ক থেকে সরে যান কৃষকরা। এরপর ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।




