
ব-দ্বীপ অঞ্চলের নিম্নভূমির দেশ হিসেবে প্রাকৃতিক নিয়মেই বন্যা ও প্লাবন এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী এবং সে বন্যার দুর্ভোগে অধিকাংশ মানুষের জীবনই এখানে পরিশ্রমের ভারে কষ্ট-ক্লান্ত। তবে পাশাপাশি এটাও সত্য যে, এই বন্যা ও প্লাবনই এর মৃত্তিকাকে অপরিসীম উর্বরতা দান করেছে। এবং বস্তুত ঐ বন্যাজনিত উর্বর মৃত্তিকারণেই খাদ্য ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে বাংলাদেশ গত সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য সে উর্বরতাকে কাজে লাগিয়ে একে ফলাফলে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে কৃষকের সৃজনশীল উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও লেগে থাকা নিরন্তর পরিশ্রমী মানসিকতারও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। মোটকথা, ভূমির উর্বরতা, কৃষকের উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও তাদের নিরলস পরিশ্রম– এ তিনে মিলেই বাংলাদেশের কৃষি আজ মোটামুটিভাবে এতোটা অগ্রসর ও বিকশিত।

তবে উপরে বর্ণিত এ আশাব্যঞ্জক চিত্রটি খুবই আবদ্ধ পরিবেশে তৈরি হিসাবের ভিত্তিতে দাঁড় করানো মূল্যায়ন। এ হিসাব ও মূল্যায়নকে যদি খোলা পৃথিবীর বৈশ্বিক মানদণ্ড ও তুলনার ভিত্তিতে দাঁড় করানো যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, সেটি অনেকখানিই ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। এবং সে ফ্যাকাশে বিবর্ণতা এক সময়কার ভূমির উর্বরতাকে যেমনি গ্রাস করছে, তেমনি কৃষকের সৃজনশীলতার কৃতিত্বকেও তা অনেকখানি ম্লান করে দিচ্ছে। আর এসব অভিমতের সরল অর্থ হচ্ছে: লোভ, অজ্ঞানতা ও অসচেনতার চক্রে পড়ে বাংলাদেশের কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের ভূমি আজ ক্রমশই অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে তার উর্বরতা হারাতে বসেছে। অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণ সহায়তা এবং উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক পরামর্শ প্রদানে রাষ্ট্রের অদক্ষ ও শিথিল ভূমিকার কারণে কৃষিখাতে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতার হারও আর সেই আগের গতিতে বাড়ছে না, যে হারে তা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বাড়ছে। বিষয়টি শুধু উদ্বেগজনকই– একইসঙ্গে বিপদজনকও। এমতাবস্থায় বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ও ব্যাপক পরিসরে আলোচনা হওয়া উচিৎ বলে মনে করি।

প্রথমেই আসা যাক জমিতে মাত্রাতিরিক্ত হারে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার প্রসঙ্গে। কৃষি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন এরূপ ব্যক্তি মাত্রই জানেন, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেচ, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও জমির গুণাগুণ ও উর্বরতার স্তরই এর মূল নির্ধারক। ফলে জমি ভিন্ন অন্যান্য উপকরণ সেখানে যতই যুক্ত করা হোক না কেন, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে জমির গুণাগুণ ও উর্বরতার স্তরকে সংরক্ষণের কেনো বিকল্প নেই। এমনকি পারলে জৈবিক উপকরণ সংযোজনের মাধ্যমে এর স্তরোন্নয়ন ঘটাবারও চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বাড়তি উৎপাদন পাওয়ার লোভে অধিকাংশ কৃষকই এখন জমিতে মাত্রাতিরিক্ত হারে ও ভারসাম্যহীন অনুপাতে সার ব্যবহারের মাধ্যমে জমির উর্বরতা সংশ্লিষ্ট মৌলিক গুণাগুণগুলোকে ব্যাপক হারে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। তদুপরি কীটনাশকের অপরিমিত ব্যবহারও বিনষ্টির এ ধারাকে আরে বেগবান করে তুলছে। আর এবের মোদ্দা ফলাফল দাঁড়াচ্ছে এই যে, সংশ্লিষ্ট জমিতে সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়লেও এক পর্যায়ে যেয়ে তা স্থবির হয়ে পড়ছে এবং এ ধরনের স্থবিরতার বাস্তব লক্ষ্মণও ইতোমধ্যে বহুক্ষেত্রে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে জমিতে সার ব্যবহারের বৈশ্বিক তুলনাটিও একটু দেখে নেয়া যেতে পারে। কৃষিতে সার ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে, বিশ্বে আবাদযোগ্য জমিতে হেক্টর-প্রতি সার ব্যবহারের পরিমাণ যেখানে ১৩৭ দশমিক ৬ কেজি, সেখানে বাংলাদেশে হেক্টর-প্রতি সারের ব্যবহার হচ্ছে ৩৯৬ কেজি, অর্থাৎ বৈশ্বিক হারের তা প্রায় ৩ গুণ। সার ব্যবহারের পাশাপাশি কীটনাশক ব্যবহারের ধারাটিও একইরকম উদ্বেগজনক। দেশে ২০১৫ সালে যেখানে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল ৩৫ হাজার ৫২৩ টন, সেখানে ২০২৪ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৩২ টনে। (‘ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো– বিবিএস)। অর্থাৎ মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে কীটনাশকের ব্যবহারের পরিমাণ ৫ হাজার ৩০৯ টন বেড়ে গেছে। মোটকথা আবাদি জমিতে সার ও কীটনাশকের এরূপ মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে জমির উর্বরতা ও মৌলিক গুণাগুণতো বিনষ্ট হচ্ছেই, একইসঙ্গে তা ফসলের উৎপাদন-ব্যয়কেও বাড়িয়ে তুলছে।

এরূপ পরিস্থিতিতে কৃষিজমিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহারকে যদি সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে সঙ্গতি রেখে ভারসাম্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভূমি অচিরেই তার উর্বরতা ও অন্যান্য মৌলিক গুণাগুণসমূহ শুধু হারাবেই না– কৃষিতে উৎপাদনের বিদ্যমান হার টিকিয়ে রাখাটাই কঠিন হয়ে পড়বে, উৎপাদনের হার বৃদ্ধির চিন্তাতো পরের কথা। এ অবস্থায় জমিতে সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ও ভারসাম্যহীন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাব এখানে তুলে ধরা হলো।
এক. গণমাধ্যমের সহযোগিতায় ও নানাবিধ গ্রহণযোগ্য উপায়ে কৃষকদেরকে এই মর্মে সচেতন করে তুলতে হবে যে, তাৎক্ষণিক ফলনের আশায় বা অন্যের প্ররোচনায় কিংবা না বুঝে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা সমীচীন হবে না। করলে তা নিজেদেরই ক্ষতি টেনে আনবে– এতে করে জমির উর্বরতা ও মৌলিক শুণাবলী ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং এক পর্যায়ে উৎপাদনের হাট ব্যাপকভাবে নিচে নেমে যাবে।
দুই. কৃষকদেরকে বুঝাতে হবে যে, মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারের মতোই ভারসাম্যহীন হারে সার ব্যবহারও অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফলে একটি জমিতে শুধুমাত্র বেশি করে ইউরিয়া ব্যবহার করলেই হবে না– একইসঙ্গে পটাশ, টিএসপি, ফসফেট ইত্যাদি সারও আনুপাতিক হারে ব্যবহার করতে হবে।
তিন. কৃষকদেরকে জানাতে হবে যে, গোবর, গাছগাছালি, লতাপাতা, রাসায়নিকমুক্ত বর্জ্য ইত্যাদি জৈব সারই হচ্ছে প্রকৃত উপকরণ, যা উৎপাদন বাড়াবার পাশাপাশি জমির ক্ষয়রোধ এবং উর্বরতা ও মৌলিক গুণাগুণ বৃদ্ধিকে সহায়তা করতে পারে।
চার. মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কৃষকদেরকে সচেতন করে তুলতে যেয়ে তাদের ধারণায় স্পষ্ট করতে হবে যে, কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শুধুমাত্র কীটপতঙ্গ বিনাশের মাধ্যমে জীববৈচিত্রকেই ধ্বংস করছে না– ফসলের উৎপাদনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পাঁচ. উপরোক্ত বিষয়গুলোতে কৃষকদের পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদেরকেও সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে, যাতে এসব উপকরণ বিক্রয়ের সময় এসব জরুরি তথ্য ও ধারণা তারা কৃষক ও ক্রেতার সাথে বিনিময় করেন।
ছয়. বাজারে বর্তমানে সাধারণ মানসম্পন্ন বীজের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে হলেও জিএম (জেনেটিক্যালি মোডিফাইড– জিএম) শ্রেণীর অবৈধ সার, বীজ, কীটনাশক পাওয়া যাচ্ছে, যা কৃষির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিৎ হবে এ ব্যাপারে কৃষক ও উপকরণ বিক্রেতাদেরকে সচেতন করার পাশাপাশি বিষয়টিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। উল্লেখ্য যে, সরকারের শিথিল ও দুর্বল বাজার পরিধারণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কতিপয় বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধিরা এসব পণ্য অবৈধভাবে বাজারজাত করছে, যা অনেক নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিকের ধারণার মধ্যেও নেই। বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যতের কৃষিকে এসব লুণ্ঠনবাদী বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর স্বার্থে সরকারের উচিৎ হবে বিষয়টিকে গোড়াতেই নির্মূল করে দেওয়া।
পরিশেষে বলবো, বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পলল মৃত্তিকা নিয়ে গড়ে ওঠা নরম মাটির যে উর্বর ভূখণ্ড নিয়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের পীড়নের মধ্যেও এ দেশের মানুষ এক সময় গর্ব করতো, সেই উর্বরতা আজ বহুলাংশেই টিকে নেই। রাষ্ট্রের ভ্রান্ত নীতি, দুর্বল ও অকার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জনসচেতনতার ঘাটতি, বণিক পুঁজির মুনাফা অর্জনের একচেটিয়া লোভ ইত্যাদি নানা কারণে সেটি হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে এ দেশে কৃষির যে বিপুল সম্ভাবনা সম্ভাবনা ছিল, তা আজ অনেকটাই ঝুঁকির মুখে। এবং সে ঝুঁকিকে আরো অধিক প্রকট করে তুলেছে সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ও ভারসাম্যহীন ব্যবহার। কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির প্রতি এখনই যথেষ্ট মনোযোগী না হলে অচিরেই তা এমন অবস্থায় চলে যেতে পারে, যেখান থেকে শত চেষ্টা ও বিনিয়োগেও সেটিকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না। অতএব যা করার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আজই করতে হবে- আগামীকাল নয়।
আবু তাহের খান
র্আথ-সামাজিক বিশ্লষক




