Spread the love

 

দেশে যত মানুষ,তাদের পুষ্টির জন্য ডিম-মাংসের যোগান দিতে হাসঁ-মুরগি আর গরু ছাগল পালতে হয় তার আড়াই গুন।  প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি, হাঁসসহ নানা ধরনের প্রাণিসম্পদের সংখ্যা ৪৫ কোটির বেশি। আর এই সব প্রাণির খাদ্যের জন্য দেশে গড়ে উঠেছে ফিডমিল বা প্রাণিখাদ্য উৎপাদন কারখানা। তাতে আমদানিনির্ভর এ খাতটি এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত  ভুট্টা এবং সয়াবিন কেকের ওপর ভর করে দেশি শিল্পে পরিণত হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ফিডের বাজার এখন প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার। আবার ফিডশিল্পের চাহিদার ওপর ভর করে দেশে ভুট্টার উৎপাদনও বাড়ছে।

কিন্তু যে খাবারের ওপর ভর করে দেশের চার ভাগের এক ভাগ আমিষের চাহিদা মেটে, সেই পোল্ট্রি ফিড নিয়ে এখন সরকারি দুই টেবিলের টানাটানি! এক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েও অন্য সংস্থার অভিযানের মুখে দিশেহারা খামারিরা—কাগজে-কলমে লাইসেন্স আছে, কিন্তু শান্তিতে ব্যবসা করার উপায় নেই।

বাংলাদেশের ফিডমিল শিল্পের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন, বিপরীতে মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ টন। পোল্ট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশুর খাদ্যের জোগান দিতে ফিডশিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করছে দেশে ।  একাধিক ফিডমিল মালিক ও খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে উৎপাদিত প্রাণিখাদ্যের ৬০ শতাংশ ব্যবহার হয় পোলট্রি খাতে। ২৫ শতাংশ ব্যবহার হয় মৎস্য খাতে। আর বাকি ১৫ শতাংশ ব্যবহার হয় গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে। দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৪০০ ফিডমিল রয়েছে। এর মধ্যে দেশজুড়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধিত ফিডমিলের সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। বাকি ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত।


২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (ফিয়াব)। যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর ফিড বা খাদ্য উৎপাদকেরা। তাদের সদস্যসংখ্যা ১১৬। সেই হিসাবে বেশির ভাগ ফিডমিল এই সমিতিভুক্ত নয়। সমিতির নেতারা বলছেন, এ খাতে যারা নিজেদের শিল্প হিসেবে গড়ে তুলেছে, তারাই মূলত সদস্য হয়। এ কারণে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক প্রতিষ্ঠান সমিতির বাইরে রয়েছে।

দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের আমিষের চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ পূরণ করে পোল্ট্রি খাত। কর্মসংস্থানের বিচারেও এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প। তবে পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিডের (খাবার) অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করে সরকারের দুটি প্রভাবশালী সংস্থার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এখন চরম সংকটে পড়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা।সমস্যার মূল উৎস আইনের অস্পষ্টতা ও দুই সংস্থার বিপরীতমুখী অবস্থান।

‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ আইন’ অনুযায়ী পোল্ট্রি খাতের ফিড অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের একক দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। অন্যদিকে, ‘মান আইন’ দেখিয়ে বিএসটিআই দাবি করছে, পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিডের গুণগত মান যাচাইয়ের এখতিয়ার তাদেরও রয়েছে। ফিড মিল মালিকদের সংগঠন ‘ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, একই পণ্যে দুই সরকারি সংস্থার দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের কারণে তারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।অভিযোগ রয়েছে, বিএসটিআই প্রতিনিধিরা সরাসরি ফিড মিলগুলোতে গিয়ে জেল-জরিমানার হুমকি দিচ্ছেন এবং তাৎক্ষণিক ৫ লাখ টাকার মতো মোটা অঙ্কের নগদ জরিমানা আদায় করছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কর্মচারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে, যা পুরো শিল্পে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে মুরগি ও ডিমের উৎপাদন খরচ বেশি থাকায় এবং নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে দাম রাখতে গিয়ে বেশিরভাগ ফিড মিল লোকসানে চলছে। এর ওপর বিএসটিআই সনদের জন্য ব্যবসার মোট টার্নওভারের ০.১ শতাংশ (শূন্য দশমিক এক শতাংশ) হারে ফি দাবি করা হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এই অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে এসিআই গোদরেজ এগ্রোভেট প্রাইভেট লিমিটেডের সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা লাইভস্টকের (প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর) অধীনে আছি না বিএসটিআই-এর অধীনে আছি, আমরা নিজেরাই জানি না। নগদ অর্থ পরিশোধ এবং ম্যানেজারদের তুলে নিয়ে যাওয়ার কথায় আমরা বিভ্রান্ত। একই উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক জানান, বিএসটিআই-এর প্রোডাক্টওয়ারি ফি এবং বর্তমান কার্যক্রম এই শিল্পকে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং একটি ভীতিজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ শাহজামান খান জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পোল্ট্রি ফিড নিয়ে বিএসটিআই-এর নজরদারি করার কথা নয়। মান পরীক্ষার জন্য তাদের নিজস্ব সর্বাধুনিক ও বৃহৎ ল্যাবরেটরি এবং মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে, যা নিরাপদ ফিড তৈরিতে সক্ষম।

অন্যদিকে, বিএসটিআই-এর উপপরিচালক মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন সরকার জানান, আইন অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক। তবে উৎপাদনকারীরা ফি বেশি মনে করলে সরকার তা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
দুই সংস্থার টানাটানিতে উদ্যোক্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই হয়রানির দ্রুত সমাধান না হলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তারা একযোগে সারাদেশে পোল্ট্রি ফিড (মুরগির খাবার) উৎপাদন ও সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন।