Spread the love

 

গুতুম মাছ বা বেতরঙি মাছের নাম শুনেছেন? নদীর পাড়ে যাদের বাড়ি আর যে বাড়িতে ছোট মাছ খাওয়ার অভ্যাস আছে, তারা নিশ্চয়ই চিনে থাকবেন। নানি-দাদি বা মায়ের হাতের কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর ধনেপাতা দিয়ে রাঁধা এই মাছভুনা দিয়ে অনেকেই খেয়ে ফেলতে পারবেন এক থালা ভাত।
কেন এই গল্প বলছি? কারণ আপনি স্বাস্থ্যসচেতন, রূপসচেতন। আপনার হার্ট ভালো রাখতে আর ফ্যাট সেল কমাতে প্রয়োজন ওমেগা-৩। আর সেই উপাদানটিই এই মাছে আছে আনলিমিটেড।


অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির সমস্যা ঘরে ঘরে। এই জটিল সমীকরণের একটি সহজ ও প্রাকৃতিক সমাধান লুকিয়ে আছে মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে, বিশেষ করে এর দুই প্রধান উপাদান- ইপিএ (EPA) এবং ডিএইচএ (DHA)।
উচ্চমাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড বা রক্তে ক্ষতিকর চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। রক্তনালীতে চর্বির আস্তরণ জমতে না দিয়ে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ইপিএ ও ডিএইচএ-র জুড়ি নেই। শুধু হার্টই নয়, ওজন কমানোর লড়াইয়েও এটি এক নীরব বিপ্লবী। গবেষণায় দেখা গেছে, মাছে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। ফলে শরীর দ্রুত ক্যালরি বার্ন করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখার অনুভূতি তৈরি করে, যা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়।


আপনি ভাবতে পারেন, ওমেগা-৩ পাওয়ার একমাত্র উৎস হয়তো দামি সামুদ্রিক স্যামন বা কড লিভার অয়েল। না, আমাদের নদী, নালা ও হাওরের গুতুম ও এর মতো ছোট মাছ যেমন—ট্যাংরা, পুঁটি পুষ্টিগুণের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়।
গুতুম মাছ আমাদের দেশের এক প্রজাতির ছোট কিন্তু অতি পরিচিত দেশি মাছ। গ্রামের জলাশয়, খাল-বিল, ডোবা বা ধানক্ষেতে সহজেই দেখা মেলে এদের। আকারে ছোট হলেও এর স্বাদ ও গুণ অনেক বড়। গুতুম মাছ সাধারণত কাদা বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে, আবার সামান্য জলেও বেঁচে থাকতে পারে—তাই একে খুব সহনশীল মাছ বলা হয়।
লোকজ বিশ্বাসেও গুতুম মাছের আলাদা গুরুত্ব আছে। অনেকে মনে করেন, অসুস্থ বা দুর্বল মানুষকে গুতুম মাছ খাওয়ালে দ্রুত শক্তি ফিরে আসে।
ছোট মাছের একটি বড় সুবিধা হলো—এগুলো কাঁটাসহ খাওয়া যায়। এর ফলে কেবল ওমেগা-৩ নয়, শরীর পায় প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন। বিশেষ করে শিশুদের হাড় ও দাঁতের গঠন, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে ডিএইচএ-র অবদান অপরিসীম। তাছাড়া, বড় মাছের ক্ষেত্রে পরিবেশে পারদ বা ভারী ধাতুর বিষাক্ততা (শোষণের ঝুঁকি যতটা থাকে, আয়ুষ্কাল ছোট হওয়ায় এই ছোট মাছে সে ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।
তবে ঠিকঠাক মতো পুষ্টি পেতে চাইলে রাঁধতে হবে একটু সামলে। সর্ষে বাটা দিয়ে ঝাল, কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা দিয়ে হালকা ঝোল, কিংবা মুচমুচে ভাজা থেকে একটু সরে আসতে হবে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ছোট মাছ বেশি কড়া করে ভাজলে তাতে থাকা তাপসংবেদনশীল ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। তার চেয়ে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, সামান্য হলুদ ও তেলের হালকা ঝোল অথবা পাতায় মুড়ে ভাপিয়ে রান্না করা ছোট মাছ পুষ্টি ধরে রাখার সবচেয়ে উত্তম উপায়। ছোট মাছের ঝোলে টমেটো বা রান্নার শেষে লেবুর রস যোগ করলে মাছে থাকা আয়রন শরীর সহজে শোষণ করতে পারে।
স্বাস্থ্যের পেছনে এত ছুটোছুটি, মেদ কমাতে জিমে যাওয়া কিংবা হার্ট ভালো রাখতে নানাবিধ ফুড সপ্লিমেন্টের পেছনে অর্থ ব্যয় করছি, তখন না হয় আরেকটু কষ্ট করে ছোট মাছের দিকে নজর দিই। তবে দুঃখের বিষয়, আগের মতো নদী-নালা, খাল-বিলে এই মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে। আমরা দ্রুতই হারিয়ে ফেলছি এই মাছদের।
গুতুম, ট্যাংরা, মলা, ঢেলা কিংবা ছোট পুঁটি গ্রামবাংলার হাটবাজারের এই অতি পরিচিত দৃশ্য কেবল স্মৃতিকাতরতা নয়, আমাদের স্বাস্থ্যের বন্ধন।