Spread the love

প্রতিদিন সকালে আমাদের প্রতিটা রান্নাঘরের কড়াইয়ে যে তেলটুকু ঢালা হয়, তার মূল্য খুব কম মানুষই অনুধাবন করতে পারেন। তেলের এই সামান্য ফোটাগুলোর পেছনে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে। বছরে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৮ শতাংশই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের সামান্য ওঠানামা মানেই সাধারণ মানুষের পকেটে বড় টান পড়ে।

তবে প্রশ্ন হলো, সারাজীবন কি এভাবে বিদেশের ওপর নির্ভর করেই থাকা হবে? উত্তরটা হচ্ছে— না! প্রধান ফসল ধানের কোনো ক্ষতি না করেই ভোজ্যতেলে নিজস্ব একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে যে ফসলটিকে রাখা যেতে পারে, তা হলো পরিচিত ‘সূর্যমুখী’।

সূর্যমুখী চাষ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বগুড়া আরডিএ প্রকল্পের মহাপরিচালক মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক জানিয়েছেন,   বরিশাল, খুলনা এবং সিলেট বিভাগে প্রচুর পতিত জমি রয়েছে, যেখানে সূর্যমুখী চাষের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সিটিটিউট ( BARI), গোপালগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি এবং  বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। সূর্যমুখী থেকে কীভাবে ‘সলভেন্ট টেকনোলজি’ ব্যবহার করে তেল নিষ্কাশন করা যায়, সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। সূর্যমুখীকে বি-ফ্লাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৌমাছির মাধ্যমে সঠিকভাবে পরাগায়ন ঘটানো হলে সূর্যমুখী বীজের ফলন প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পায়। সূর্যমুখী চাষের মাধ্যমে একদিকে যেমন তেল পাওয়া যাবে, অন্যদিকে মধু সংগ্রহও করা সম্ভব হবে, যার মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হচ্ছে। শুধু দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাতেই শীতকালে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততা ও পানির অভাবে খালি পড়ে থাকে। সেই পতিত জমিতে যদি খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল সূর্যমুখী ফুটিয়ে তোলা যায়, তবে আমদানির এক বিশাল বড় ধাক্কা সামলে নেওয়া সম্ভব হবে।

অনেকেই  সয়াবিনের কথা বলেন,  কিন্তু  সয়াবিন বীজে তেলের পরিমাণ খুব কম। তার জায়গায় সূর্যমুখী বীজে তেলের পরিমাণ প্রায় ৪৫ থেকে ৪৮ শতাংশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ একই জায়গা থেকে সূর্যমুখী থেকে দ্বিগুণ তেল ফেরত পাওয়া যাবে।  তবে শুধু সূর্যমুখীই নয়, ঐতিহ্যের সরিষা, তিল আর তিসিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমন আর বোরো ধানের মাঝে অল্প কটা দিনের বিরতিতে সরিষা ফলানো যায়। চরাঞ্চল আর পাহাড়ে সহজে তিল ও তিসি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

তাছাড়া চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, রান্নায় শুধু এক ধরনের তেল না খেয়ে সূর্যমুখী, সরিষা ও তিলের মতো প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ তেলের সংমিশ্রণ খাওয়া হলে রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়। স্বাস্থ্য ও অর্থ— দুটোই একসাথে বাঁচানো সম্ভব! এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে  সূর্যমুখী ও অন্যান্য তেলবীজের চাষ ৪০ থেকে ৫০ হাজার হেক্টরে উন্নীত করার লক্ষ্য  ধরা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মাঠপর্যায়ে কৃষককে বীজ, ঋণ ও উন্নত প্রযুক্তির সহযোগিতা দিতে হবে।

অনেক সময় কৃষকদের দিয়ে ভালো ফসল ফলানো হলেও তেল মাড়াই করার ভালো কলের অভাবে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। গ্রামে গ্রামে আধুনিক তেল নিষ্কাশন মেশিন বসাতে হবে, যাতে এক ফোঁটা তেলও অপচয় না হয়। সরকার ও দেশের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল কেনার গ্যারান্টি দিতে হবে।

শাঁওলী সুমন