
জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় কৃষি দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের প্রতিকূল এই মাটিতেই এবার আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার লেবুখালীতে অবস্থিত বারির আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে উপকূলীয় এলাকায় বিদেশি জাতের আম ও বারোমাসি পেয়ারা চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৩১টি বিদেশি আমের জাত (জার্মপ্লাজম) নিয়ে মাঠপর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। উপকূলের আবহাওয়ায় এসব জাতের ফলন, আকার, রং, স্বাদ, রোগ প্রতিরোধ ও সংরক্ষণক্ষমতা যাচাই করাই এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। একাধিক মৌসুমের পরীক্ষায় বেশ কয়েকটি জাত ইতিমধ্যে দারুণ কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

গবেষণায় সফলতা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা আম এর গবেষণায় ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে-
আকর্ষণীয় লাল আম: মিয়াজাকি, লেডি জেন, চিয়াংমাই, তাইওয়ান রেড, কুজাই এবং কিং চাকাপাত জাতে মনকাড়া লাল খোসার বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। বাজারে লাল আমের সরবরাহ কম থাকায় এগুলো ভবিষ্যতে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলতে পারে।
বিশাল আকৃতির আম: ব্রুনাই কিং জাতের একটি আমের সর্বোচ্চ ওজন পাওয়া গেছে ২ কেজি ৩৫১ গ্রাম, যা সাধারণ আমের চেয়ে অনেক বড়।
উচ্চ মিষ্টতা ও শাঁস: চিয়াংমাই জাতের আমে শাঁসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৮১ শতাংশ খাওয়ার উপযোগী অংশ)। অন্যদিকে, সাদা দোফালা জাতের আমে সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ ব্রিক্স বা দ্রবণীয় শর্করা পাওয়া গেছে, যা এর উচ্চ মিষ্টতার প্রমাণ।
অফ-সিজন ও ভালো ফলন: চোকানোন জাতের আমে প্রধান মৌসুমের বাইরেও ফল ধরার বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দেবে। এছাড়া চিয়াংমাই জাতের সম্ভাব্য হেক্টর প্রতি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২.৭৩ টন। কিংস্টন প্রাইড ও কাটিমন জাতও ভালো ফলন দিচ্ছে।
দীর্ঘ স্থায়িত্ব: বানানা ম্যাঙ্গো ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৯ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে, যা দূর-দূরান্তে পরিবহন ও রপ্তানির জন্য বেশ সুবিধাজনক।
শুধু আমের জাত নির্বাচনই নয়, জলাবদ্ধ এলাকায় বারোমাসি পেয়ারা এবং লবণাক্ত পরিবেশে আম ও পেয়ারা চাষের উপযোগী আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছে বারি।

গবেষণার সুফল সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে উন্নত চারা বিতরণ, বাগান ব্যবস্থাপনা, সার ও বালাইনাশক প্রয়োগের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বারি। ফলে পটুয়াখালীসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলে ফল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে উপকূলীয় অঞ্চলে বিদেশি আম চাষের ধারণা তাদের ছিল না। এখন ধানের পাশাপাশি ফল চাষের মাধ্যমে আয়ের নতুন উৎস তৈরি হচ্ছে। তবে চাষাবাদ আরও বাড়াতে উন্নত চারার সহজলভ্যতা, আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান জানান, উপকূলের প্রতিকূল জলবায়ু মাথায় রেখেই এই গবেষণা চলছে। বেশিরভাগ জাতই আকার, রং ও স্বাদে চমৎকার ফলাফল দিয়েছে। তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আরও কয়েক মৌসুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সেরা ও টেকসই জাতগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন করা হবে। কৃষকদের লাভবান করতে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।





