Spread the love

মিষ্টির জন্য একেক অঞ্চলের রয়েছে একেক খ্যাতি। কেউ ভালোবাসেন বগুড়ার দই, কেউ কুমিল্লার রসমালাই, আবার কেউবা নাটোরের কাঁচাগোল্লা। তবে আপনি যদি খাঁটি ছানা আর গুড়ের মেলবন্ধনে তৈরি কোনো অনন্য মিষ্টির খোঁজ করেন, তবে আপনাকে আসতেই হবে যশোরের শার্শা উপজেলার জামতলায়। এখানকার ‘সাদেক গোল্লা’ (যা স্থানীয়ভাবে জামতলার মিষ্টি নামেই বেশি পরিচিত) তার অতুলনীয় স্বাদ, সুগন্ধ এবং ঐতিহ্যের কারণে দেশের মিষ্টির ইতিহাসে এক গৌরবময় স্থান দখল করে আছে।

জামতলার এই বিশেষ মিষ্টির জনক শেখ সাদেক আলী। দেশভাগের পর ১৯৫৫ সালের দিকে যশোরের শার্শা উপজেলার জামতলা বাজারে তিনি একটি ছোট চায়ের দোকান শুরু করেন।

প্রথমে দোকানে চা-নাস্তার পাশাপাশি তিনি সাধারণ রসগোল্লা তৈরি করতেন। তবে সাদেক আলী সবসময় চাইতেন এমন কিছু তৈরি করতে যা স্বাদে হবে অনন্য। 

জামতলার পাশেই ছিল দেশসেরা খেজুর গুড়ের হাট। সাদেক আলী ভাবলেন, চিনির বদলে যদি খাঁটি খেজুরের গুড় আর গরুর খাঁটি দুধের ছানা মেশানো যায়, তবে কেমন হয়? এই ভাবনা থেকেই তিনি তৈরি করেন সম্পূর্ণ নতুন এক রসগোল্লা।

 

অল্প সময়ের মধ্যেই এই মিষ্টির স্বাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জামতলায় আসতেন শেখ সাদেকের হাতের এই বিশেষ গোল্লা খেতে। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই এই মিষ্টির নাম হয়ে যায় ‘সাদেক গোল্লা’।

 

একটি সাধারণ রসগোল্লা থেকে সাদেক গোল্লা সম্পূর্ণ আলাদা। এর বিশেষত্বের পেছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও উপকরণের সততা:

এই মিষ্টি তৈরিতে কোনো ময়দা, সুজি বা অন্য কোনো ভেজাল উপাদান (হাইড্রোজ বা প্রিজারভেটিভ) ব্যবহার করা হয় না। শতভাগ গরুর খাঁটি দুধের নরম ছানা দিয়ে এটি তৈরি হয়।

সাদেক গোল্লার প্রধান আকর্ষণ এর হালকা বাদামী রঙ এবং মন মাতানো সুগন্ধ, যা আসে স্থানীয় খাঁটি নলেন গুড় (খেজুরের গুড়) থেকে। গরমকালে গুড় না পাওয়া গেলে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত গুড় ব্যবহার করা হয়।

 

এই মিষ্টি অতিরিক্ত মিষ্টি হয় না, ফলে চার-পাঁচটি খেলেও মুখে একঘেয়েমি আসে না। মুখে দেওয়া মাত্রই এটি নরম তুলার মতো মিলিয়ে যায় এবং ভেতর থেকে নলেন গুড়ের সুস্বাদু রস বের হয়ে আসে।

সাদেক গোল্লা তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ ধৈর্যের। প্রথমে গভীর রাতে স্থানীয় গোয়ালাদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে তা থেকে নরম ছানা তৈরি করা হয়। এরপর ছানা ভালো করে ময়ান দিয়ে ছোট ছোট গোল্লা তৈরি করা হয়।

অন্য একটি বড় কড়াইয়ে খেজুরের গুড় ও পানির মিশ্রণে পাতলা সিরা তৈরি করা হয়। সিরা যখন ফুটতে শুরু করে, তখন ছানার গোল্লাগুলো তাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট আঁচে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়ার পর গোল্লাগুলো সিরা চুষে নিয়ে টইটম্বুর হয়ে ওঠে এবং ধারণ করে সেই কাঙ্ক্ষিত বাদামী রঙ ও সুগন্ধ।

শেখ সাদেক আলী আজ আর বেঁচে নেই (১৯৯৯ সালে তিনি প্রয়াত হন), তবে তাঁর তিন ছেলে আনোয়ার হোসেন, শাহজাহান আলী ও জাহাঙ্গীর আলম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বাবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। জামতলার মূল দোকান ছাড়াও এখন যশোর শহরেও এর শাখা রয়েছে।

রসনা তৃপ্তির এই আইটেমটি এখন শুধু যশোর বা বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যশোর অঞ্চলের মানুষ যখনই ঢাকা বা দেশের অন্য কোথাও যান, জামতলার মিষ্টি তাদের সাথে যাবেই। এমনকি আমেরিকা, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের জন্যও এই মিষ্টি কুরিয়ার বা আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে নিয়মিত পাঠানো হয়।

অনেকেই বলেন “যশোরে এসে যদি জামতলার সাদেক গোল্লা না খাওয়া হয়, তবে যশোর ভ্রমণই বৃথা। এর প্রতিটি কামড়ে পাওয়া যায় বাংলার মাটির খাঁটি সুবাস।”

শত শত আধুনিক মিষ্টির ভিড়েও সাদেক গোল্লা তার নিজস্বতা হারায়নি। এটি শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি যশোরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং শেখ সাদেক আলীর সততা ও নিষ্ঠার এক জীবন্ত দলিল। শত ব্যস্ততার মাঝেও জামতলার মোড়ে থমকে দাঁড়িয়ে এক ঠোঙা গরম গরম সাদেক গোল্লা মুখে পুরে দেওয়া যে কোনো মিষ্টিপ্রেমীর জন্যই এক পরম তৃপ্তি।