
হাজার বছর ধরে এই পলল ভূমির বুক চিরে যে ফসলের উৎসব, তার আদি ও অকৃত্রিম কারিগর আমাদের কৃষক। লাঙলের ফলায় মাটির বুক চিরে যখন প্রথম বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল সভ্যতার পথচলা। মাটি আর বীজ—এই দুই প্রাণের স্পন্দনই যুগ যুগ ধরে টেকসই রেখেছে আমাদের কৃষি ঐতিহ্যকে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার কৃষকের কাছে মাটি কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এক পরম নির্ভরতার নাম; আর বীজ হলো আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার রক্ষাকবচ। কিন্তু প্রযুক্তির আধুনিকায়ন আর বিশ্বায়নের এই যুগে এসে সেই আদিম সখ্যতা আজ এক বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে, সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সেই সংকটকে কতটা দূর করতে পারলো, তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

ঘোষিত এই বাজেটকে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা ‘সার্বিকভাবে কৃষিবান্ধব’ হিসেবে দাবি করলেও, দেশের কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের চোখে এর ভিন্ন রূপ ধরা পড়েছে। তাঁদের মতে, এবারের বাজেটটি মূলত “কৃষকবান্ধব কিন্তু কৃষিবান্ধব নয়”। অর্থাৎ, ব্যক্তি হিসেবে কৃষকের জন্য কিছু সাময়িক পকেট-সুবিধা বা নগদ প্রণোদনা থাকলেও, সামগ্রিক কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও কাঠামোগত সুরক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
ইতিবাচক দিক, ‘কৃষকবান্ধব’

প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের সাময়িক স্বস্তি দিতে বাজেটে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । ১,০৬২ কোটি টাকার ‘কৃষক বাজেট: দেশের ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষককে সহায়তার লক্ষ্যে ১,০৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা সরাসরি নগদ অর্থ ও প্রণোদনা পাবেন। শুল্ক ও অগ্রিম কর রেয়াত: রাসায়নিক সার উৎপাদনে ভ্যাট ও শুল্ক কমানো হয়েছে। পাশাপাশি কীটনাশকের ওপর থেকে বিদ্যমান অগ্রিম কর বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। শতকরা ৪ ভাগ রেয়াতি সুদে ঋণ: ডাল, তেলবীজ ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের জন্য মাত্র ৪% রেয়াতি সুদে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে । যান্ত্রিকীকরণ ও হিমাগার: মাছ চাষের আধুনিকায়ন, কৃষি পুনর্বাসন এবং ফসল সংরক্ষণের জন্য নতুন হিমাগার (Cold Storage) নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কেন বাজেট ‘কৃষিবান্ধব নয়’ ?

কৃষকের পকেটে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছালেও, যে কাঠামোগত ব্যবস্থার ওপর দেশের কৃষি খাত দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে রয়ে গেছে এক গভীর ক্ষত । মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় প্রকৃত বরাদ্দের পতন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ সামান্য বাড়লেও (২৮,৮৮১ কোটি টাকা), দেশের বর্তমান ৯% মূল্যস্ফীতির (Inflation) তুলনায় তা অনেক কম। ফলে প্রকৃত অর্থে (Inflation Adjusted) কৃষি খাতের প্রকৃত বরাদ্দ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।

সিন্ডিকেট ও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: কৃষকের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদারদের সিন্ডিকেট ভাঙা বা কৃষিপণ্যের জন্য কোনো স্বাধীন ‘দাম কমিশন’ (Price Commission) গঠনের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা বাজেটে অনুপস্থিত। জলবায়ু ও জ্বালানি সংকট উপেক্ষা: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় কৃষি বীমা (Crop Insurance) চালু কিংবা সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাজেটে নেই। গবেষণায় চরম উদাসীনতা: দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ গবেষণায় যে পরিমাণ বড় তহবিল বরাদ্দ করা দরকার ছিল, তা এই বাজেটে উপেক্ষিত।

পরিবেশগত শঙ্কা: রাসায়নিকের অতি–ব্যবহার ও মাটির মৃত্যু
বাজেটে রাসায়নিক সারের সহজলভ্যতা ও শুল্ক ছাড়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা পরিবেশবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ। এটি সাময়িক উৎপাদন বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা চিরতরে ধ্বংস করছে:
১. মাটির অম্লতা ও পুষ্টিহীনতা: অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে মাটির পিএইচ (pH) নষ্ট হচ্ছে। একটি আদর্শ মাটিতে অন্তত ৫% জৈব পদার্থ থাকা দরকার, যা বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের মাটিতে এখন ১%-এর নিচে নেমে এসেছে।
২. মরুভূমিকরণ ও দূষণ: রাসায়নিকের প্রভাবে মাটির উপকারী অণুজীব ও কেঁচো মারা যাচ্ছে, ফলে মাটি শক্ত হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা হারাচ্ছে। এছাড়া বৃষ্টির পানিতে এই রাসায়নিক ধুয়ে নদী-নালা ও খাদ্যশৃঙ্খলে মিশে বিষাক্ততা তৈরি করছে।
এক নজরে কৃষি বাজেট ২০২৬–২৭
ব্যক্তি কেন্দ্রিক সুবিধা দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেটকে কৃষকবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী । কিন্তু নতুন সরকারের প্রথম বাজেট কৃষিবান্ধব হয়নি কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির আশঙ্কায় । সবচেয়ে বড় ক্ষতি যে হবে যুক্তরাষ্ট্রেন সাথে সই করা বাণিজ্য চুক্তিতে, তার কোনো উল্লেখই নাই বাজেট আলোচনায়।
আর্থিক নীতি ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ ও ৪% সুদে ঋণ দেয়ার প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও,মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত বাজেট গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।বাজার ব্যবস্থা উৎপাদন পর্যায়ে সাময়িক শুল্ক ও অগ্রিম কর ছাড় থাকলেও কৃষিপণ্যের বাজার টালমাটার করার সিন্ডিকেট দমন বা ‘মুল্য কমিশন ( Price Commission )’ গঠনের কোনো উদ্যোগ নেই। ভবিষ্যত সুরক্ষা তরুণদের জন্য অ্যাগ্রোপ্রেনিউরশিপ পলিসির দেখা মেলেনি বাজেট প্রস্তাবনায় । জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলা ও বীজ গবেষণায় বরাদ্দের অভাবও রয়ে গেছে নীতি-সহায়তার জায়গায়।
তাহেলে কি পেলো কৃষি ?
সরকার কৃষকদের কিছু অনুদান ও কার্ড দিয়ে সাময়িকভাবে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে, যা রাজনৈতিকভাবে চমৎকার কৌশল হতে পারে। কিন্তু যে কাঠামোগত ব্যবস্থার মধ্যে কৃষি টিকে থাকে—যেমন বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভ্যালু চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণা ও সেচ সুবিধার জায়গায় রয়ে গেছে বড় ফাঁকি।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃতির সেই আদিম নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেবল রাসায়নিক সারে ভর্তুকি না দিয়ে, পরিবেশবান্ধব জৈব ও কম্পোস্ট সার উৎপাদন এবং সুষম সার ব্যবহারে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই আপাত ‘কৃষকবান্ধব’ বাজেট দীর্ঘমেয়াদে আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন মাটির উর্বরতা ও প্রকৃতি ধ্বংসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
শাঁওলী সুমন





