
পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুবাস পাবেন গ্রামে গেলেই । বাঙালির বারো মাসের ফল-ফলারির ভিড়ে পাকা কাঁঠাল অনন্য । তবে শুধু কোঁয়া খাওয়ার মধ্যেই পাকা কাঁঠালের মহিমা শেষ হয়ে যায় না। রসনাবিলাসী বাঙালি নারীরা পাকা কাঁঠালের প্রতিটি কোঁয়া আর রসকে ব্যবহার করে তৈরি করেছেন পিঠা, মিষ্টি ও ক্ষীরের এমন সব ঐতিহ্যবাহী পদ, যা এ দেশের রন্ধনশিল্পকে করেছে সমৃদ্ধ। কাঁচা এঁচোড়ের পর্ব চুকিয়ে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সৌরভে রান্নাঘরে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, তারই কিছু কালজয়ী পদের গল্প নিয়ে এই আয়োজন।

কাঁঠালের বড়া: বৃষ্টির দিনে মুচমুচে কামড়
মেঘলা দিনে বা ঝুম বৃষ্টিতে গরম-গরম কাঁঠালের বড়ার চেয়ে লোভনীয় আর কী হতে পারে! পাকা কাঁঠালের মিষ্টি রস বের করে নিয়ে তার সাথে আতপ চালের গুঁড়ো, সামান্য ময়দা, চিনি আর কোরানো নারকেল মিশিয়ে তৈরি করা হয় ঘন ব্যাটার। এরপর তা ডুবো তেলে ছোট ছোট গোল বলের মতো করে ভাজা হয়। ওপরটা মুচমুচে আর ভেতরটা তুলতুলে নরম এই বড়া মুখে দিলেই ছড়িয়ে পড়ে কাঁঠালের তীব্র মিষ্টি সুবাস।

দুপুরের পাতে ঐতিহ্যবাহী ‘কাঁঠাল ঘাটা’ বা পাকা কাঁঠালের চাটনি
আমাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের আমলের এক লুপ্তপ্রায় ও অনন্য সৃষ্টি হলো ‘কাঁঠাল ঘাটা’। সাধারণত ঘরে বেঁচে যাওয়া বা একটু শক্ত আঁশযুক্ত খাজা কাঁঠালের কোঁয়া দিয়ে এই চাটনি তৈরি করা হয়। সামান্য সর্ষে ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে কাঁঠালের কোঁয়াগুলো লবণ-হলুদে সামান্য কষিয়ে জল দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। সবশেষে চিনি দিয়ে মাখামাখা করে তৈরি এই হালকা মিষ্টি স্বাদের চাটনিটি মুখের রুচি ফেরাতে অতুলনীয়। দুপুরের খাবারের শেষ পাতে এই পদের আবেদন আজও আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।

কাঁঠাল পাতার ভাপা পিঠা
পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে তৈরি ভাপা পিঠা গ্রামীণ বাংলার এক চিরায়ত উৎসবের অংশ। কাঁঠালের রসের সাথে চালের গুঁড়ো ও গুড় মেখে একটি ঘন মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর তা তাজা কাঁঠাল পাতা বা কলাপাতার ভেতর পুরে দিয়ে সুনিপুণভাবে মুড়ে ভাপে সেদ্ধ করা হয়। ভাপানোর সময় পাতার নিজস্ব একটি বুনো সুবাস পিঠার ভেতরে প্রবেশ করে, যা এর স্বাদ ও ঘ্রাণকে নিয়ে যায় এক অন্য মাত্রায়।
কাঁঠালের ক্ষীর ও পায়েস
পাকা কাঁঠালের রসালো মিষ্টি স্বাদ দুধের সাথে মিশে তৈরি করে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধে গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে তৈরি পায়েস যখন প্রায় ঘন হয়ে আসে, তখন আঁচ বন্ধ করে তাতে মিশিয়ে দেওয়া হয় পাকা কাঁঠালের ঘন সুমিষ্ট রস। ওপর থেকে কাজুবাদাম, পেস্তা ও কিশমিশ ছড়িয়ে ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে পরিবেশন করা এই ক্ষীর যেকোনো সাধারণ ভোজকেও রাজকীয় রূপ দিতে পারে।
বাঙালি নারীর হেঁশেলের ঐতিহ্য যেকোনো সাধারণ সবজি বা ফল-ফলারিকে করে তুলতে পারে অনন্য রসনাতৃপ্তির উপকরণ। তাই পাকা কাঁঠাল স্রেফ একটি ফল নয়, বরং এক অফুরন্ত সৃজনশীলতার উৎস। প্রযুক্তির যুগে এসে আমরা অনেক আধুনিক ডেজার্টের দিকে ঝুঁকলেও, মা-ঠাকুমাদের হাতের এই পাকা কাঁঠালের বড়া, ভাপা পিঠা কিংবা কাঁঠাল ঘাটার স্বাদ নিশ্চয়ই আমাদের শেকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়!
শাঁওলী সুমন





