
কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ বজায় রেখে এই খাত থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান বাড়ানোর জন্য নীতিসহয়তায় পরিবর্তন আনতে একটি কৃষি কমিশন হতে পারে। তবে তার চেয়েও বশি দরকার কৃষি খাতের একটা হালনাগাদ পর্যালোচনা ও যথাযথ মূল্যায়ন, যা সবশেষ হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। এমন সুপারিশ কৃষি বিষয়ে নাগরিক সংলাপের আলোচকদের । নিরাপদ কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ের নিউজ পোর্টাল ক্ষেতে-পাতে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে উঠে আসে এমন অভিমত। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন ) কুষি তথ্য সার্ভিসের (AIS) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতে এই আলোচনায় অংশ নেন কৃষি শিক্ষাবিদ , অর্থনীতিবিদ,সাবেক সরকারি কর্মকর্তা,ব্যবসায়ি, এনজিও প্রতিনিধি,গবেষক এবং গনমাধ্যম ব্যাক্তিত্বরা।কৃষি পন্যের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে সংলাপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রাইস কমিশন’ গঠনের জোর দাবি জানান।

একটি কমিশন হলে আপত্তি নাই তবে তার চেয়েও দরকার কৃষিখাতের একটি নিবিড় পর্যক্ষেণ (রিভিউ)। কৃষি নাকি কৃষক— কার উপকার হবে প্রণোদনায়, সেটাও মূল্যায়ন করতে হবে। দেশের জ্যেষ্ঠ কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম. এ. সাত্তার মন্ডল । ‘বাজেট ২০২৬-২৭: কী পেলো কৃষি?’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে তিনি বলেন, কৃষি প্রণোদনা ও বাজেটের সুফল প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তার সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নের দরকার । তাঁর মতে, সনাতন কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে উত্তরণের এই ক্রান্তিলগ্নে নীতি-নির্ধারকদের প্রণোদনা বিতরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে। প্রায় ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই মেগা বাজেটে কৃষি খাতের জন্য আপাতদৃষ্টিতে বড় বরাদ্দ দেখা গেলেও, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের অধিকার ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবে উপাচার্য আবদুস সাত্তার বলেন, বাজেটের একটি নির্দিষ্ট ব্যাকরণ রয়েছে, যা এনবিআর আয়ত্ত করেছে। তবে এ ব্যাকরণ না বোঝা কৃষকদের উদ্বেগ, তারা কী পেলো? আমাদের কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, তবে মনে রাখতে হবে উৎপাদন কমছে না। কিছুটা গ্যাপ আছে। এটা কীভাবে পূরণ করা যাবে এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

সংলাপে বক্তারা ফার্মিংকে টেকসই বা ‘Thriving’ করতে হলে “ক্ষেত থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর” একটি সমন্বিত কৃষি চেইন বা ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার দিকে জোর দিয়েছেন। সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুকের মতে বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় সংকট হলো ফসলোত্তর অপচয় (Post-harvest loss)।, সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, অপচয় রোধে আধুনিক কোল্ড চেইন বা কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে বলেও মত দেন তিনি। বিসেফ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি আনোয়ার ফারুক বলেন লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের চার ভাগের এক অংশ নষ্ট হয়। অথচ এই অপচয়টুকু রোধ করা গেলে দ্রুত খাদ্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব।

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৮,৮৮১ কোটি টাকা। আপাতদৃষ্টিতে বাজেট বৃদ্ধির হার প্রায় ৬০ শতাংশ হলেও, সংলাপে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ডেকোরেশন বা নীতি বাস্তবায়নের মোড়কে আসল কাজ যেন ব্যাহত না হয়। বাজেটের এই শুভঙ্করের ফাঁকিটি মূলত সামগ্রিক লবিং সংস্কৃতির ফসল। এই অঞ্চলে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি বা লবিস্টদের কারণে প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকরা ন্যায্য সুবিধা পান না। বড় কর্পোরেট ফার্মগুলো বড় রকমের সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা লুফে নিলেও, প্রান্তিক চাষীদের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ভর্তুকি পৌঁছায় না। ফলে মেগা বাজেটের সুফল মূলত ধনীদের দিকেই ঝুঁকে থাকে, যা এক ধরনের গভীর ‘পলিসি ক্রাইসিস’। বাজেটের আগে তৃণমূল কৃষকদের কথা শুনতে হবে। কোনো তথাকথিত কৃষক নেতা বা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নয়, বরং মাঠপর্যায়ের সাধারণ কৃষকরা কী চান— বাজেটে তার সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন থাকা জরুরি।

সংলাপের অন্যতম প্রধান চিন্তার বিষয় ছিল দেশের দ্রুত হ্রাস পাওয়া আবাদি জমি। বিশিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে আবাদি কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। এক সময় দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৮% এর কাছাকাছি থাকলেও, অকৃষি খাতে জমির লাগামহীন ব্যবহারের কারণে তা বর্তমানে কমে ১১.৫% বা তার নিচে নেমে এসেছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব কৃষির সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধির জোর দাবি জানিয়ে ড. নজরুল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন: “আমাদের নতুন চিন্তাভাবনা করতে হবে, জমিকে আর অকৃষি কাজে দেওয়া যাবে না।”

সংলাপে একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বীজ, সার, সেচ এবং মাটির লবণাক্ততা নিয়ে দুশ্চিন্তা। কৃষি বাজেট বলতে প্রথমেই আলোচনায় আসে কৃষক সার পাচ্ছেন কিনা। প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সার আছে কিনা তা নিয়ে ভাবা হয় পরে। কৃষিখাতে একটি বড় অংশ দখল করে আছে বীজ। সেই বীজ ব্যবস্থা নিয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই বললেই চলে। একজন কৃষক সারাবছরই কৃষিকাজ করেন না। অন্যান্য কাজও করেন। এই কৃষককার্ডটি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছাবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ জানান আলোচকরা।

অধ্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মি আলোচনায় নিউট্রিশন, ভ্যালু চেইন ম্যাপিং বিষয়ে জোর দেন। কৃষি একটি ঝুঁকিবহুল কাজ। অ্যাগ্রো প্রসেসিং এবং অ্যাগ্রো বিজনেসে নারী-পুরুষ উভয়কেই যুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন একটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে সরকারকেই, কৃষক যেন সহজে লোন নিতে পারেন আবার সহজে ফেরত দিতে পারেন। কর্মসংস্থানের বিচারে অবশ্যই কৃষি একটি বড় সেক্টর।

সংলাপের সঞ্চালক ক্ষেতেপাতে ডটকমের সম্পাদক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিক এবং অন্যান্য বক্তাদের কণ্ঠে একটি মৌলিক দর্শন প্রতিধ্বনিত হয়েছে— “উৎপাদন বাড়িয়ে কোনো লাভ নাই, যদি সেই খাদ্য নিরাপদ না হয়।” আজকের দিনে শুধু ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ (Food Security) নয়, বরং ‘পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য’ (Safe Food) নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড়挑戰। অথচ মাঠের বাস্তব চিত্র হলো নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন এবং মাছ ও মুরগির খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

আলোচকরা জোর দিয়ে বলেন বৈষম্য দৃশ্যমান ব্যাংকিং খাতের ক্রেডিট পলিসিতে। দেশের ডেইরি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতের জন্য বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ ও পুনঃঅর্থায়নের কথা বলা হলেও, ব্যাংকের জটিল কাগজের প্রক্রিয়াকরণ তৃণমূলের খামারিরা বোঝেন না। ফলে গরিব কৃষক ও ক্ষুদ্র খামারিরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়ে লোন ডিফল্টার বা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এই বৈষম্য দূর করতে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে লোন ফরম সহজ করার দাবি জানানো হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকায়ন, উদ্যোক্তাদের কর রেয়াত এবং উপকূলীয় ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে কেবল কাগজের বাজেট দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়।

দ্য ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদের বলেন, কৃষির সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কৃষি কমিশন গঠন প্রয়োজন।

বেসরকারিখাতের প্রতিনিধি হিসেবে সুপ্রীম সিডের স্বত্তাধিকারী মোহম্মদ মাসুম বলেন ” দেশের আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো প্রাণিসম্পদ (লাইভস্টক) ও দুগ্ধ শিল্প। আমরা এখনো বিপুল পরিমাণ গুঁড়ো দুধ আমদানি করি, অথচ সঠিক নীতি ও সহযোগিতা পেলে এই খাতেই বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। তিনি দেশের উত্তরাঞ্চলকে ‘বীজ হাব’ (Seed Hub) হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। উত্তরাঞ্চলে যদি ব্যাপকভাবে বীজ উৎপাদন করা যায় এবং সেখানে কর অব্যাহতি (ট্যাক্স হলিডে) দেওয়া হয়, তবে দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটবে। সেই সঙ্গে ফসলভিত্তিক কৃষিবিমা বা ক্ষতিপূরণ চালু করা এবং কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন। সর্বোপরি, দেশের কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে বেসরকারি খাতের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।”

সংলাপে মৎস অধিদপ্তরের সাবে মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন: “কৃষি কাজ বা লাইভস্টক (প্রাণিসম্পদ) নিয়ে আলোচনা হলেও ফিশারিজ বা মৎস্য চাষ নিয়ে কোনো কথা নেই। চিংড়ি শিল্প নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। সর্বোপরি মৎস্য খাত নিয়ে বাজেটে বড় ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। এই খাতের ৯৯.০৯ শতাংশই প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি খাত টিকিয়ে রেখেছে। অথচ শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ও প্রস্তাব চাষি পর্যায়ে পৌঁছায় না। সরকারের উচিত মৎস্য খাতসহ সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করা।” আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. আমজাদ হোসেন , অ্যাকশন এইডের প্রতিনিধি অমিত দে , বিসেফ পলিসি লিংকের মাহমুদ হাসান, গলবায়ু গবেষক মাহমুদ হাসান সেলিম, ক্ষেতেপাতের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আতাউর রহমান মিটন ও পরামর্শক প্রণব সাহা ।
দেশের ২০টি প্রধান নদী-নালা এবং ৪৪টি নদী পুনঃখননের মাধ্যমে যেখানে ‘ইলিশের অভয়াশ্রম’ (হিলশা রিজার্ভ) গড়ার কথা, সেখানে উপকূলীয় ব্লু-ইকোনমি ও সামুদ্রিক মাছ ধরার নিয়মে কড়া নজরদারির অভাব স্পষ্ট বলেও অভিমত আলোচকদের। অথচ শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো “এক গ্রাম, এক পণ্য” নীতি বাস্তবায়ন করতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে যেতে পারত। সরকার ডিজিটাল ‘কৃষি কার্ড’ বা সার-উপকরণের ওপর ভর্তুকির কথা বললেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশে প্রায় ৪২ লক্ষ ৫০ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক রয়েছেন। বড় কৃষকদের জমি যখন ছোট কৃষকরা বর্গা বা লিজ নিয়ে চাষ করেন, তখন এই ডিজিটাল কার্ডের সুবিধা প্রকৃত চাষীর কাছে পৌঁছায় না, থেকে যায় জমির মালিকের পকেটে।
আলোচকরা বলেন সরকাররের উচিত ডেকোরেশনের মোড়ক থেকে বেরিয়ে কৃষিতে সমবায় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ৪২ লক্ষাধিক প্রান্তিক কৃষকের অধিকার রক্ষা করা। তবে সব আলোচকই ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, যাই করা হোক না কেন যদি নির্মোহ ও নির্লোভ ভাবে করা যায় তাহলেই শুধুমাত্র কৃষকের লাভ হবে। একই সঙ্গে কৃষিও লাভজনক সেক্টরে পরিণত হবে।





