Spread the love

 

চৈত্র মানেই বাংলার প্রকৃতিতে খাঁ খাঁ রোদ, দুপুরের তপ্ত বাতাস আর বিকেলের নীল আকাশে কালবৈশাখীর ঘনঘটা। কিন্তু এবারের চৈত্র এসেছে এক ভিন্ন রূপ নিয়ে। যেখানে ঘাম ঝরানো গরম থাকার কথা, সেখানে প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে নেমেছে ঠান্ডা-হিম। ভোরের আকাশ ঢাকা পড়ছে ঘন কুয়াশায়, যা দেখে মনে হতে পারে এ যেন পৌষ বা মাঘের কোনো শীতের সকাল। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা কেবল দুশ্চিন্তার ভাজ ফেলেছে কৃষকের কপালে। হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকেও।

এই অসময়ের শীত ও কুয়াশা ফসলের ওপর ত্রিমুখী আঘাত হানছে।এমন আবহাওয়ায় বোরো ধানের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।  এখন বোরো ধানের থোড় আসা বা পরাগায়নের সময়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে এবং ঘন কুয়াশা থাকলে ধানের পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ধানের দানা পুষ্ট না হয়ে প্রচুর পরিমাণে ‘চিটা’ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হঠাৎ ঠান্ডা ও আর্দ্রতায় পেঁয়াজ, রসুন ও আদার কন্দ গঠন ব্যাহত হচ্ছে। শিম, লাউ বা কুমড়ো জাতীয় সবজির ফুল ঝরে যাচ্ছে মৌমাছির অভাবে, কারণ কুয়াশার কারণে পরাগায়নকারী পতঙ্গরা সক্রিয় হতে পারছে না।

আলু ও টমেটোর প্রধান শত্রু ‘লেট ব্লাইট’ বা ছত্রাকজনিত মড়ক। ঘন কুয়াশা আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এই রোগের জন্য আদর্শ পরিবেশ। সামান্য অবহেলায় রাতারাতি বিঘার পর বিঘা আলুক্ষেত কালো হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

কৃষকরা বলছেন, চৈত্রে এমন কুয়াশা দেখি নাই। সকালে মাঠে গেলে ধানগাছ ভিজে থাকে, মনে হয় রাইতে বৃষ্টি হইছে। এই শীতে যদি পরাগায়ন না হয়, তবে কপাল পুড়বে আমাদের। চরে চাষ হওয়া রবিশস্যও এখন কুয়াশার কামড়ে বিবর্ণ।

এই দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ :

#     ছত্রাকজনিত রোগ ঠেকাতে ম্যানকোজেব বা মেটালাক্সিল গ্রুপের ছত্রাকনাশক সঠিক পরিমাণে স্প্রে করতে হবে।

#     বোরো ক্ষেতে রাতের বেলা ৫-৭ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হবে, যাতে তাপমাত্রা খুব বেশি নিচে না নামে।

# ভোরে রোদ ওঠার আগে রশি বা লাঠি টেনে ধানগাছ থেকে কুয়াশার পানি ঝরিয়ে দিন। এটি ছত্রাক সংক্রমণ কমাবে।

#     গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এমওপি (পটাশ) সার ব্যবহার করা যেতে পারে।

#     যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করুন।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক সেমিনারের আলোচনার বিষয় নয়; এটি আমাদের খাবার টেবিলেও টান দিচ্ছে। চৈত্রের এই অসময়ের ঠাণ্ডা আবহাওয়া আমাদের শঙ্কিত করছে।   বদলে যাওয়া প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে হলে সনাতন আরও বেশি বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদের ওপর জোর দিতে হবে।

শাঁওলী সুমন