
তপ্ত রোদে যখন চারপাশ ওষ্ঠাগত, তখন এক বাটি ঠান্ডা পান্তা ভাত যেন বাঙালির অবর্তমানেও এক পরম তৃপ্তির নাম। এক সময় কেবল গ্রামীণ বা খেটে খাওয়া মানুষের খাবার ভাবা হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান বলছে— তপ্ত গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এবং তাৎক্ষণিক পুষ্টির জোগান দিতে পান্তা ভাতের জুড়ি মেলা ভার।
পান্তা ভাত নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় (বিশেষ করে ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায়) যে চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
গবেষণার চোখে পান্তা ভাত: পুষ্টির ‘পাওয়ারহাউস’
সাধারণ ভাত যখন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রেখে গাঁজন (Fermentation) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তখন এর পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক গঠনে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফারমেন্টেশনের কারণে ভাতে থাকা ‘অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট’ (যেমন ফাইটিক অ্যাসিড) ভেঙে যায়, যার ফলে ভাতের ভেতরের লুকিয়ে থাকা খনিজ উপাদানগুলো আমাদের শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে।

গবেষকদের মতে, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে আয়রনের পরিমাণ থাকে মাত্র ৩.৪ মিলিগ্রাম। কিন্তু সেই একই পরিমাণ ভাত রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালে পান্তা হওয়ামাত্রই আয়রনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩.৯ মিলিগ্রাম! অর্থাৎ, আয়রনের পরিমাণ বাড়ে প্রায় ২১ গুণ, যা রক্তস্বল্পতা দূর করতে দারুণ কার্যকরী।
ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের খনি
গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সাধারণ ভাতের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম তৈরি হয়, যা গরমের দিনে আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
তীব্র গরমে পান্তা ভাতের অনন্য গুণাগুণ
পান্তা ভাত একটি প্রাকৃতিক কুল্যান্ট (Coolant)। গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে পান্তা ভাতের পিএইচ (pH) লেভেলে পরিবর্তন আসে। গরমে এটি খেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শরীর দীর্ঘক্ষণ ঠান্ডা অনুভূত হয়। ফলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।
তীব্র গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। পান্তা ভাতের সাথে যে পানি (আমানি) থাকে, তা খনিজ লবণে ভরপুর। এই পানি পানের ফলে শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং জলশূন্যতা দূর হয়।
হজমশক্তি বৃদ্ধি ও পেটের স্বস্তি
ফারমেন্টেশনের ফলে পান্তা ভাতে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া (Probiotics) তৈরি হয়। এই প্রোবায়োটিকস গরমের দিনে বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক এবং ডায়রিয়ার মতো পেটের রোগ প্রতিরোধ করে পাকস্থলীকে শান্ত রাখে।
ক্লান্তি দূর করে তাৎক্ষণিক শক্তি
গরমের দিনে সামান্য পরিশ্রমেই আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পান্তা ভাতে থাকা কার্বোহাইড্রেট খুব সহজেই ভেঙে শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়। ফলে শরীরে অলসতা কেটে যায় এবং কর্মস্পৃহা ফিরে আসে।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ: পান্তা ভাতের সর্বোচ্চ গুণাগুণ পেতে এতে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ এবং সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া ভালো। কাঁচা মরিচের ভিটামিন সি পান্তা ভাতের আয়রনকে শরীর দ্বারা দ্রুত শোষণ করতে সাহায্য করে। তবে পান্তা ভাত তৈরিতে ব্যবহৃত জল অবশ্যই বিশুদ্ধ বা ফোটানো হতে হবে এবং ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ভিজিয়ে রাখা যাবে না, যাতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে না পারে।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পান্তা ভাত কোনো সস্তা বা সাধারণ খাবার নয়, বরং এটি গরমের দিনের একটি উৎকৃষ্ট ‘সুপারফুড’। তাই এই তীব্র দাহদাহে কৃত্রিম এনার্জি ড্রিংকস বা কোল্ড ড্রিংকসের পেছনে না ছুটে, পরম তৃপ্তি আর সুস্বাস্থ্যের জন্য সকালের নাস্তায় নির্দ্বিধায় বেছে নিতে পারেন এক বাটি ঐতিহ্যবাহী পান্তা ভাত।





