
বাংলাদেশে তামাক চাষ দীর্ঘদিন ধরেই একটি লাভজনক বলে বিবেচিত ফসল। কৃষকেরা সহজ ঋণ, অগ্রিম টাকা এবং বাণিজ্যিক কোম্পানির সহায়তার কারণে এই ফসলে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—তামাক চাষের আর্থিক সুফলের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে পরিবেশ, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ক্ষতি।
মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়
গবেষণা বলছে, তামাক এমন একটি ফসল যা জমির পুষ্টি দ্রুত শোষণ করে নেয়। ফলস্বরূপ, একই জমিতে পরবর্তী মৌসুমে ধান, ভুট্টা বা সবজি উৎপাদন কমে যায়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে জমির জৈব মানও দ্রুত নষ্ট হয়।
পরিবেশ ও বন উজাড়ের ঝুঁকি
তামাক পাতা শুকানোর জন্য বড় পরিমাণে জ্বালানির প্রয়োজন হয়। অনেক এলাকায় এখনও কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা বন উজাড় বাড়ায়। নদী তীরবর্তী অঞ্চলে তামাক চাষ সম্প্রসারণের ফলে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
কৃষকের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
তামাক গাছের চারা রোপণ, সার প্রয়োগ এবং পাতায় রাসায়নিক ব্যবহারের সময় কৃষকরা বিভিন্ন চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভোগেন। বিশেষ করে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’-এর মতো সমস্যা—যা তামাক পাতার নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হলে হয়—অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়।
খাদ্যনিরাপত্তায় বিরূপ প্রভাব
একদিকে দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে উপযোগী কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। এমন সময়ে ধান, ডাল, শাকসবজি বা ফলের বদলে তামাক চাষ বাড়তে থাকলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।
অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি
তামাক চাষে তাৎক্ষণিক লাভ থাকলেও চিকিৎসাব্যয়, পরিবেশগত ক্ষতি, জমির উর্বরতা নষ্ট, ও কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেশি। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে—এক কেজি তামাক উৎপাদনের বিপরীতে রাষ্ট্রকে বহন করতে হয় বহুগুণ স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ব্যয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—তামাকের বিকল্প লাভজনক ফসল যেমন—ভুট্টা, মসুর, সূর্যমুখী, মরিচ, তিল, বাদাম ও সবজি—কৃষকদের কাছে প্রচার করা জরুরি। এতে কৃষক একই সঙ্গে লাভবান হবেন এবং কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা পাবে।





