
পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও): ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার পটুয়াপাড়া ও আশপাশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যে বইছে আনন্দের হাওয়া। দীর্ঘদিন পলি জমে ভরাট ও অবৈধ দখলের কবলে পড়ে প্রায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছিল প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ অন্তার ও চাপোড় খাল। তবে সম্প্রতি সফল পুনঃখননের মাধ্যমে খাল দুটি ফিরে পেয়েছে নতুন জীবন, আর তার সঙ্গেই ঘুচেছে শত শত কৃষকের বছরের পর বছর ধরে সহ্য করা জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা।
উপজেলার হাজীপুর ও সেনগাঁও ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত অন্তার খাল (যা আমতলিতে কাহানাই নদীতে মিশেছে) এবং পীরগঞ্জ ইউনিয়নের চাপোড় খাল (যা মছলন্দপুরে টাঙ্গন নদীতে যুক্ত হয়েছে) গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। খালের গর্ভ ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেখানে গম, ভুট্টা ও আখের চাষ চলত, আর বর্ষায় সৃষ্টি হতো মারাত্মক জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল ভেসে যেত, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল দুটি পুনঃখনন করা হয়। গত ২ মে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ এই কাজের উদ্বোধন করেন এবং ৩০ জুনের মধ্যে সফলভাবে খনন কাজ শেষ হয়। স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক তদারকিতে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদার।
পুনঃখনন ও আশপাশের কৃষিজমির সাথে ড্রেনেজ-সংযোগ নিশ্চিত করার পর চলতি বর্ষাতেই খাল দুটি কানায় কানায় পানিতে ভরে উঠেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে চারপাশজুড়ে:
দ্রুত পানি সরে যাওয়ায় মাঠে ফসল ডুবে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা কেটে গেছে। পটুয়াপাড়ার স্থানীয় কৃষক নবাব ও আব্দুর রহমান জানান, এখন আর অতিরিক্ত পানিতে ফসল নষ্ট হবে না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্পের ফলে এলাকায় কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
স্বাভাবিক পানির প্রবাহ ফিরতেই বিলে থাকা দেশীয় মাছ—শোল, টাকি, পুঁটি, খলিশা, কই ও শিং খাল দুটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার যুবক আলমগীর ও আকরাম জানান, তারা এখন খালের পানিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, আনোয়ারা বেগম ও কইলী রানীর মতো স্থানীয় নারীরা খালের পানি ব্যবহার করে হাঁস পালনের নতুন স্বপ্নের কথা জানান।
খালের দুই পাড় সবুজ ঘাসে ঢেকে দেওয়া হয়েছে এবং রোপণ করা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার সুপারি গাছ। অন্তার ব্রিজের সংযোগস্থলে খালের দুপাশে শোভা পাচ্ছে কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। হাঁটার মনোরম পথ তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এটি এখন একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
খাল দুটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে ১৫টি সমিতি (অন্তার খালে ১০টি এবং চাপোড় খালে ৫টি)। হাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ও পীরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোকলেসুর রহমান চৌধুরী জানান, খালের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে তাদের বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কষ্টার্জিত এই সাফল্য ধরে রাখতে খাল দুটি যাতে পুনরায় দখল বা ভরাটের শিকার না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। সরকারি এই উদ্যোগকে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি জাহিদুর রহমান জনকল্যাণমুখী উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন।





