Spread the love

 

চকলেট! কারও জন্য  শৈশবের নস্টালজিয়া, কারও জন্য প্রথম ভালোবাসার স্মারক। চকলেটের নাম শুনলে জিভে জল আসে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে খুব কমই। এক টুকরো ডার্ক চকলেট কিংবা মিল্ক চকলেটের কামড় নিমেষেই দূর করে দিতে পারে সারা দিনের ক্লান্তি, মনকে করে তুলতে পারে প্রফুল্ল। আধুনিক লাইফস্টাইলে চকলেটের চমৎকার প্যাকেজিং, কাস্টমাইজড চকলেট, হার্ট-শেপড বক্স কিংবা প্রিমিয়াম হ্যাম্পারের কারণে এটি এক স্টাইলিশ গিফট আইটেম। এই উপহারে মিশে থাকে সরলতা ও আভিজাত্য। কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতার যুগে কোন চকলেট বেছে নেবেন—ডার্ক, মিল্ক নাকি হোয়াইট? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি চকলেটের পুষ্টিগুণ যেমন আলাদা, তেমনি একেকজনের পছন্দের চকলেটের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে তাঁদের ব্যক্তিত্বেরদিকও।

চকলেট: ভালো না খারাপ?

চকলেট শরীরের জন্য ভালো নাকি খারাপ—এই বিতর্ক বেশ পুরোনো। উত্তরটা লুকিয়ে আছে চকলেটের ধরনে। পুষ্টিবিদদের মতে, ডার্ক চকলেট শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে সাধারণত ৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকো থাকে। কোকোতে থাকা ফ্ল্যাভানল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের হাত থেকে রক্ষা করে। পরিমিত ডার্ক চকলেট খেলে হৃৎস্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।তবে মিল্ক বা হোয়াইট চকলেটে কোকোর পরিমাণ কম এবং চিনি ও ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় তা অতিরিক্ত খেলে ওজন বৃদ্ধি বা রক্তে শর্করা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই চকলেট খাওয়া খারাপ নয়, তবে তা হতে হবে পরিমিত এবং তা ডার্ক চকলেট হওয়াই ভাল ।

চকলেট ঘিরে কিছু প্রচলিত মিথ এবং সত্য

আমাদের সমাজে চকলেট নিয়ে কিছু মিথ বা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা দূর করা দরকার। যেমন মিথ  আছে যে  চকলেট খেলে দাঁত নষ্ট হয় এবং ব্রণ হয়। কিন্তু  সত্যটাহচ্ছে চকলেটের মূল উপাদান ‘কোকো’ দাঁত বা ত্বকের ক্ষতি করে না। ক্ষতিটা করে চকলেটে থাকা অতিরিক্ত চিনি। ভালো মানের ডার্ক চকলেট খেলে ব্রণের ঝুঁকি থাকে না, বরং এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের জন্য ভালো।আবার যে কেউই বলবে যে   চকলেট ওজন বাড়ায়। কিন্তু জানা দরকার , চকলেটের চিনি ওজন বাড়াতে পারে, কিন্তু উচ্চ কোকোসমৃদ্ধ ডার্ক চকলেট মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে। একই সাথে তা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে। প্রশ্ন হচ্ছে  হোয়াইট চকলেটও এক ধরনের চকলেট কি না ?। জবাব চকলেট হরেও ,জানা দরকার  হোয়াইট চকলেটে কোনো ‘কোকো সলিডস’ বা আসল কোকো থাকে না। এটি মূলত কোকো বাটার, দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি। তাই একে শতভাগ চকলেট বলা যায় না।

মেসো-আমেরিকা থেকে আধুনিক বিশ্ব: চকলেটের রাজকীয় ঐতিহ্য

চকলেটের ইতিহাস প্রায় ৪,০০০ বছরের পুরোনো। এর উৎপত্তি প্রাচীন মেসো-আমেরিকায় (বর্তমান মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা)। মায়া এবং আজটেক সভ্যতার মানুষেরা কোকো বীজকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করত। তারা কোকো বীজ দিয়ে এক ধরনের তিতা ও মসলাযুক্ত পানীয় তৈরি করত, যাকে বলা হতো ‘এক্সোকোল্যাটল’ (Xocolatl) বা তেতো জল।আজটেক সাম্রাজ্যে কোকো বীজ এতটাই মূল্যবান ছিল যে, তা মুদ্রা হিসেবে লেনদেনে ব্যবহৃত হতো। ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের হাত ধরে কোকো প্রথম ইউরোপে পৌঁছায়। সেখানে এই তিতা পানীয়তে চিনি ও দুধ মিশিয়ে একে রাজকীয় ও অভিজাতদের পানীয় হিসেবে রূপ দেওয়া হয়। শিল্প বিপ্লবের পর উনবিংশ শতাব্দীতে এসে এটি আজকের কঠিন চকলেটের রূপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।

চকলেট কেন ভালোবাসার প্রকাশ ?

প্রেমের সম্পর্ক হোক কিংবা গভীর বন্ধুত্ব , চকলেট সবসময়ই সম্পর্ককে উষ্ণ করে তোলে। কিন্তু ভালোবাসার সাথে চকলেটের এই সংযোগ কেন? জবাবটা এমন যে  চকলেট খাওয়ার পর আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের মনকে আনন্দিত করে এবং ভালোবাসার এক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। চকলেটে থাকা ‘ফিনাইলইথাইলামিন’ (PEA) নামক রাসায়নিক উপাদানকে বলা হয় ‘লাভ ড্রাগ’, যা প্রেমে পড়লে মানুষের মস্তিষ্কে তৈরি হয়।

এছাড়া চকলেটের স্বাদ ও টেক্সচার মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তি আনে। তাই মুখে যা বলা যায় না, একটি চকলেট প্রিয় মানুষের কাছে সেই গভীর ভালোবাসা ও অনুভূতির নীরব বার্তা পৌঁছে দেয় অনায়াসেই ।

বিশ্ব চকলেট দিবস কেন জুলাই ?

প্রতি বছর ৭ জুলাই বিশ্ব চকলেট দিবস বা ইন্টারন্যাশনাল চকলেট ডে পালিত হয়। কিন্তু কেন এই দিনটিকেই বেছে নেওয়া হলো? ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫৫০ সালের ৭ জুলাই ইউরোপে প্রথম চকলেটের আনুষ্ঠানিক আগমন ঘটেছিল। মেসো-আমেরিকা থেকে ইউরোপে চকলেটের এই ঐতিহাসিক প্রবেশকে স্মরণীয় করে রাখতেই ২০০৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৭ জুলাই চকলেট দিবস হিসেবে উদযাপন করা শুরু হয়। অবশ্য বছরের অন্যান্য সময়েও ভিন্ন ভিন্ন দেশে চকলেট ডে পালন করা হয়, তবে ৭ জুলাই সারা বিশ্বে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে  চকলেট শিল্পে

গত কয়েক বছরে আমাদের দেশের চকলেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে।এক সময়ের সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর এবং উচ্চবিত্তের বিলাসী পণ্য, আজ  দেশি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত সুপারশপ—সবখানেই  শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি বৈচিত্র্যময় চকলেট।

বর্তমানে বাংলাদেশে চকলেট ও চকলেটজাতীয় পণ্যের বার্ষিক বাজারের আকার তিন হাজার কোটি টাকার বেশি এবং প্রতি বছর এই বাজার ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশি জায়ান্টদের নেতৃত্ব: প্রাণ কনফেকশনারি, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, আকিজ বেকার্স (যাদের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘হাই-ফাইভ’), পারটেক্স, এসিআই ফুডসের মতো বড় বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠান এখন বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া গত ৩-৪ বছরে ‘হ্যান্ডমেড’ বা হাতে তৈরি চকলেটের ক্ষেত্রেও এক অভূতপূর্ব সাড়া দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ববাজারে রপ্তানি: বাংলাদেশের চকলেট এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৪.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চকলেট ও কোকো প্রস্তুতকৃত খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করে।

বাংলাদেশের চকলেট শিল্পের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও এর মূল চ্যালেঞ্জ হলো চকলেটের প্রধান কাঁচামাল (কোকো বিন, কোকো পাউডার ও কোকো বাটার) সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। ডলার সংকট ও বৈশ্বিক বাজারে কোকোর দাম বাড়ায় , বাড়ছে চকলেট  উৎপাদনের খরচ । তাই ভালোমানের চকলেট খেতে খরচও বাড়বে বৈকি !