Spread the love

চাল উৎপাদনের অন্যতম জেলা নওগাঁ থেকে শুরু করে দেশের প্রধান বাজার রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পর্যন্ত চালের দাম বাড়ছে । সেটা আবার সুগন্ধি চিনিগুড়া চাল। পাইকারি,খুচরা এবং মিল-মালিকরা সঠিক করে কেউই এই বাড়তি দামের সঠিক কারন না বলে একে অপরের ওপর চালের দাম বাড়ার দায় চাপাচ্ছেন ।  রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়িরা বলছেন গত ছয় মাসে দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। চলতি বছরের শুরুতে যে চাল প্রতি কেজি ১৪০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন খুচরা বাজারে ২১৫ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী—তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে রপ্তানিকারক, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

রাজধানীর ব্যবসায়ীদের মতে, গত ছয় মাসে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি চালের খুচরামূল্য কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ঢাকার পলাশী বাজারের চাঁদপুর স্টোরের মালিক সাখাওয়াত হোসেন জানান, ছয় মাস আগে পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ১২৮ থেকে ১৩৫ টাকায় কেনা সুগন্ধি চাল খুচরা বাজারে প্রায় ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সম্প্রতি পাইকারি বাজারে দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় বাধ্য হয়ে একই চাল খুচরা বিক্রেতাদের ২১৫ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে নওগাঁর বাজারে এক মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যে চাল গত মাসেও ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। নওগাঁ পৌর খুচরা ও পাইকারি চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে আতপ চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে বলে তথ্য মিলেছে। মাসের হিসাবে এই বৃদ্ধি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। বর্তমানে খোলা বাজারে মানভেদে চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চালের দাম ২০০ থেকে ২১০ টাকা।
একই সময়ে কাটারি ও জিরাশাইলসহ চিকন চালের দামও বেড়েছে। বর্তমানে এসব চাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকা কেজি। যদিও মোটা স্বর্ণা-৫ চালের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। একজন ক্রেতার মন্তব্য  ‘আগে মাসে দুই-তিন কেজি চিনিগুঁড়া চাল কিনতাম। এখন এক কেজি কিনতেই হিসাব করতে হয়। বাচ্চাদের জন্য বা অতিথি এলে পোলাও রান্না করাও কঠিন হয়ে গেছে।’ বাজারে অন্য ক্রেতাদের অভিযোগ, “ অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা পাচ্ছেন না “ কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে অসাধু চক্র সুযোগ নিচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

নওঁগার ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না।’নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে চিনিগুঁড়া চালের দাম যে হারে বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।’ পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সুবল চন্দ্র সেন বলেন, ‘করপোরেট কোম্পানিগুলো প্যাকেটজাত চালের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় খোলা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

আবার রাজধানী ঢাকার বাবুবাজারের প্রত্যাশা রাইস এজেন্সির ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন জানান,  “আমরা পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনছি। শুনেছি সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু হয়েছে, যে কারণে দাম বেড়েছে। আগামী সপ্তাহে পাইকারি পর্যায়ে দাম কেজিতে আরও ১০ টাকা বাড়তে পারে।” বাজারে খোজঁ নিয়ে দেখা গেছে প্রাণ, চাষী, ফ্রেশ ও এরফান ব্র্যান্ডের এক কেজি প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়; সেখানে রূপচাঁদার প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, ইস্পাহানি পার্বণ ১৭৫ টাকায় এবং ইসি ডেইলি বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়।

চট্টগ্রামের বাজারেও মানভেদে চিনিগুড়া সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়; মাত্র কয়েক মাস আগেও যা ছিল ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম সাংবাদিকদের জানান,  “সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর দেশীয় বাজারে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। রপ্তানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

জানা গেছে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় গত ১৩ মে ২১১টি প্রতিষ্ঠানকে এবং ১৪ জুলাই আরও ৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। চাল রপ্তানিকারকরা অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির জন্য রপ্তানিকে দায়ী করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন; তারা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর জন্য দায়ী করছেন কিছু মিল মালিককে।বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন জানান, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মত চাল রপ্তানি হয়েছে। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করতেই সরকার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু কিছু মিল মালিক চাল মজুত করে রাখেন এবং দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি ।উল্লেখ্য  বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় দশ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ছয় লাখ টন। এর চেয়ে বেশি পরিমান সুগন্ধি চিনিগুড়া চাল দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে কিনিা সেটা অনুসন্ধার করা দরকার বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।