Spread the love

 

শরতের আগমনে কাশের পাশাপাশি স্যাঁতসেঁতে উঠোন আর নারকেল গাছের গুঁড়িতে উঁকি দেয় থানকুনি, বাঙালির কাছে যার আরেক নাম লুচি-পাতা। বাঙালির কাছে অনাদরে বেড়ে ওঠা এই পাতা যেন সাক্ষাৎ মহৌষধ। বাংলার মাঠঘাট রূপ নেয় এক প্রাকৃতিক ‘সাধনা ঔষধালয়’এ।

প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও চীনা ভেষজ চিকিৎসায় থানকুনি ‘দীর্ঘজীবনের ভেষজ’ বা ‘হাঁটুর সমান উঁচু এক জাদুকরী ভেষজ’ হিসেবে। ইংরেজিতে যা ‘গোটুকোলা’ নামে খ্যাত।

 

বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও ঘরোয়া চিকিৎসায় থানকুনি পাতার ব্যবহার ঠিক কত প্রাচীন, তা সুনির্দিষ্ট সাল-তারিখ দিয়ে মাপা কঠিন। তবে সেন ও পাল যুগের প্রাচীন চিকিৎসাসংহিতা, চরক সংহিতা এবং সুশ্রুত সংহিতায় ব্রাহ্মী ও মান্দুকপর্ণী (থানকুনির প্রাচীন নাম) হিসেবে এর ব্যবহার পাওয়া যায়। অর্থাৎ, হাজার বছরেরও আগে থেকে নদীমাতৃক বাংলার জনপদ ও চিকিৎসায় এই পাতার উপস্থিতির সুস্পষ্ট ইতিহাস রয়েছে।

বাঙালির আদি রসনা ও ‘পথ্য’ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে থানকুনি অনন্য। যখন জটিল অ্যান্টিবায়োটিকের জন্ম হয়নি, তখন পেটের আমাশয়, পেটের গণ্ডগোল কিংবা ঋতু পরিবর্তনের রোগবালাই রুখতে বাঙালি মায়েরা ভরসা করতেন পাতার রসের ওপর। ‘খাবারই ওষুধ’এই আবহমান বাঙালি দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ থানকুনি পাতার ভর্তা ও হালকা ঝোল। প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা টোটকা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন দুপুরের ভাত-পাতে কচি থানকুনি পাতার ব্যবহার বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে আছে।

প্রতি ১০০ গ্রাম থানকুনি পাতায় মিলে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ক্যালরি।  এতে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও আয়রন। স্নায়ুতন্ত্র ও চোখের সুরক্ষায় ভিটামিন এ, বি-কমপ্লেক্স এবং সি-এর ভূমিকা অনন্য। আর এতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট—ফ্ল্যাভোনয়েড ও ট্রাইটারপিনয়েড শরীরকে নানাবিধ ক্রনিক রোগের হাত থেকে রক্ষা করে।

অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে লিভারে জমা হওয়া বিষাক্ত উপাদান নিষ্কাশন বা ডিটক্সিফিকেশনে এটি অত্যন্ত কার্যকর। ত্বকের প্রদাহ ও ব্রণ কমাতে থানকুনির জুড়ি নেই। আয়রন ও ভেষজ গুণ মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে চুল পড়া রোধ করে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।

গর্ভাবস্থা বা দ্রুত ওজন বাড়া কমার ফলে শরীরে যেসব স্ট্রেচ মার্ক পড়ে, তা কমাতেও থানকুনি উপকারী, কারণ এটি ত্বকে কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে।     প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ক্ষত দ্রুত শুকাতে এবং দাগ কমাতে সাহায্য করে। তাই কাটাছেঁড়ায় থানকুনিসমৃদ্ধ মলমের ব্যবহার রয়েছে। থানকুনির প্রদাহনাশক উপাদান বাত বা জয়েন্টের প্রদাহের ব্যথা ও ক্ষয় কমাতে কাজ করে।

থানকুনি পাতায় থাকা উপাদান মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং স্নায়ুকোষকে সক্রিয় রাখে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি স্ট্রোকের পর স্মৃতিভ্রংশ বা মনোযোগের সমস্যায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আলঝেইমার্স রোগে মস্তিষ্ক কোষকে ক্ষতির হাত থেকে আংশিকভাবে রক্ষা করতে এটি সহায়ক বলে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ইঙ্গিত মিলেছে।

মস্তিষ্কের পাশাপাশি থানকুনি স্নায়ুকে শান্ত করতে পারে  মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে এটি আরামদায়ক। দীর্ঘসময় বসে থাকা বা ভ্রমণের কারণে অনেকের পা ও গোড়ালি ফুলে যায়। থানকুনি শরীরে তরল জমে থাকা কমাতে এবং রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

প্রকৃতির এই সহজলভ্য উপাদানটি পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখলে বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি কোনো জাদুকরী ওষুধ বা চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্প নয়।

শরৎ কি শুধু কাশ আর শিউলির? এখানে সেখানে লুচি-পাতা দেখা না-গেলে কীসের শরৎ ?

শাঁওলী সুমন