
উপকূল ও নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চারণভূমি হাজার হাজার গবাদিপশুর টিকে থাকার মূল ভরসা। সেখানেই থাবা বসিয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পশু চরাতেও গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। টাকা না পেলে বিষ ছিটিয়ে ঘাস মেরে ফেলার নজিরও তৈরি হয়েছে। বিষাক্ত ঘাস খেয়ে মারা গেছে মহিষ। যমুনা ও পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এই চরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই কাশবন আর সবুজ ঘাসের মাঠ তৈরি হয়। বহু বছর ধরে আশপাশের গ্রামের হাজার হাজার মানুষ এই চরে বাথান তৈরি করে জীবন চালান। দুধ ও মাংসের জোগান দিয়ে এই খামারিরা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু পুরো চরাঞ্চলকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে ক্ষমতাশালী অপরাধীরা।

তারা চরের সরকারি খাসজমি একের পর এক দখল করে নিচ্ছে। ফলে গরু-মহিষের অবাধ বিচরণের জায়গা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।
খামারি ও রাখালরা জানান যে এখন চরে ঢুকতে গেলেই গুণতে হয় বিঘাপ্রতি এক হাজার থেকে আঠারো শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা। দলবেঁধে মহিষ চড়াতে গেলে হাজার হাজার টাকা তোলা গুনতে বাধ্য করা হয়। যারা এই চাঁদা দিতে পারেন না বা দেওয়ার সাহস দেখান না, তাদের ওপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। বাথানে হামলা চালিয়ে মারধর করা হয় রাখালদের। তাদের আশ্রয় ভেঙে দেওয়া হয়। এমনকি গবাদিপশু জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই জুলুমের পথ ধরে অপহরণ চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি চরঘাঘুয়া থেকে চারজন রাখালকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা। তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। পরে বাথানমালিকরা বাধ্য হয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনেন। পুলিশ প্রশাসনের কাছে গিয়েও বেশিরভাগ সময় সাধারণ রাখালরা কোনো সুরক্ষা পান না। উল্টো সন্ত্রাসীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।
চাঁদাবাজির সবচেয়ে নৃশংস রূপ দেখা যাচ্ছে ঘাসে বিষ দেওয়ার ঘটনায়। রাখালরা চাঁদা না দিলে রাতের বেলা বিষাক্ত কীটনাশক ছিটিয়ে দেওয়া হয় মাইলের পর মাইল চারণভূমিতে। স্থানীয় খামারিরা জানান, চরাঞ্চলের এই অপরাধ সাম্রাজ্য শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের দখলে নেই। চরের নিয়ন্ত্রণ আর ভাগের টাকা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও রক্তক্ষয়ী মারামারি নিয়মিত বিষয়। সারিয়াকান্দির পাকুরিয়া চরে এমন এক দখলদারির জেরে মুসলেম উদ্দীন নামের এক স্থানীয় মাতব্বরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি পাকুরিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মুসলেমের মৃত্যুর পরও পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি। বরং এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এখন সেই পক্ষের হাল ধরেছেন স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শাহজাহান। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গিয়াস খান ও হায়দার খান। তারা মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মনজুর কাদের বাবুল খানের চাচাতো ভাই হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ফলে চরের সাধারণ মানুষ দুই পক্ষের মারামারির মাঝে পড়ে পিষ্ট হচ্ছেন। অপরাধের ধরন বদলায় না, শুধু ক্ষমতার হাতবদল হয়।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে চরের কোনো অপরাধ বা দখলদারির সঙ্গে তাদের কোনো কর্মী বা নেতার সম্পৃক্ততা নেই। দলের দায়িত্বশীল নেতারা দাবি করেছেন যে ব্যক্তিগত অপরাধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে চরের মানুষের মাঝে ক্ষোভ অনেক দিনের। মাদারগঞ্জ ও সারিয়াকান্দির পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে চাঁদাবাজির বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত নালিশ জমা পড়েনি। তবে লিখিত অভিযোগ না আসার পেছনে চরের মানুষের ভয় কাজ করে। প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে নাম লেখালে চরে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিষ দিয়ে ঘাস পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে চরাঞ্চলে এখন দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ঘাস শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে শত শত খামারি এখন নিজেদের শেষ সম্বল নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন। দুধ বিক্রি করে যাদের সংসার চলে, পশুর চিকিৎসা আর খাবারের খরচ মেটাতে তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।

চারণভূমির দখল নিশ্চিত করতে বা চাঁদা না পেয়ে ঘাসে বিষ মিশিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংসতা মানুষের নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের মতে, কেবল চাঁদাবাজিই নয়, পশুর মুখে বিষ তুলে দিয়ে এমন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিলে চরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গবাদিপশু পালন শিল্প পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে।
– শাঁওলী সুমন



