Spread the love

 যুদ্ধের প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি এক বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।  চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে সমুদ্রপথে আলু রপ্তানি কমেছে ১৯ হাজার ৯৩৯ দশমিক ৩৭০ মেট্রিক টন। শতাংশের হিসাবে এ পতন ৪৯ দশমিক ১৮ শতাংশ।এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে আলু রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমেছে ৫৪ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

রপ্তানিকারকদের দাবি, যুদ্ধের প্রভাবে কনটেইনারপ্রতি ভাড়া প্রায় চার গুণ বেড়েছে। তাদের মতে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আলু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে দূরবর্তী বাজারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া সরাসরি রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে আগের মতো লাভজনক দামে আলু রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে ৪০ হাজার ৫৪২ দশমিক ৯২৯ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬০৩ দশমিক ৫৫৯ মেট্রিক টনে।

রপ্তানি কমার পাশাপাশি এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১ কোটি ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮১ দশমিক ০১ ডলারের আলু রপ্তানি করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৫৪৬ দশমিক ৭৯ ডলারে।

চট্টগ্রাম ফ্রেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব রানা বলেন, “চলমান ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে একটি কনটেইনারের ভাড়া যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আলু রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে রপ্তানির পরিমাণও কমে গেছে।”মাহবুব রানা আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও মালয়েশিয়ায় আলু রপ্তানি হয়। তবে মিশর ও সিরিয়ায় আলুর বাম্পার ফলন হলে এসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বেশি পরিমাণে আলু সরবরাহ করে। এতে ওই বাজারে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা ও রপ্তানি কমে যায়।

 

রপ্তানিকারকরা জানান, বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য আলুর বড় অংশ আসে মুন্সিগঞ্জ, রংপুর ও বগুড়া থেকে। সাধারণত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কৃষকরা আলু সংগ্রহ করে বাজারে সরবরাহ করেন। এরপর জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত রপ্তানি চলে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের আলু রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ। ফলে একদিকে রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম ও চাহিদা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে বছরের শেষ ছয় মাসে সংরক্ষিত আলুতে অনেক সময় অঙ্কুর গজাতে শুরু করে। এতে আলুর মান নষ্ট হয় এবং তা রপ্তানির অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

রপ্তানিকারকদের মতে, বছরজুড়ে আলু রপ্তানি ধরে রাখতে আধুনিক সংরক্ষণ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা প্রয়োজন।

রপ্তানিকারক মো. ফোরকান বলেন, আলু রপ্তানিতে কোল্ড চেইন ঠিক রাখা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। হিমাগার থেকে আলু বের করার পর গ্রেডিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং করতে বেশ সময় লাগে।তিনি বলেন, এ সময় আলু স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকে। ফলে পরে রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে তোলার পরও আলুর মান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, হিমাগার থেকেই সরাসরি রিফার কনটেইনারে আলু তোলা গেলে এ সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

 

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আলু রপ্তানি করেছে মালয়েশিয়ায়। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৫৬ দশমিক ৬৩ ডলারের আলু। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা নেপালে রপ্তানি হয়েছে ৩৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬৪ দশমিক ৬৮ ডলারের আলু।

এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩ দশমিক ৭৮ ডলার, সৌদি আরবে ২ লাখ ৮২ হাজার ৩৬৫ দশমিক ৫৭ ডলার, সিঙ্গাপুরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭০৪ দশমিক ২৩ ডলার, মিয়ানমারে ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৪১ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় ৯০ হাজার ১৫৯ দশমিক ০৪ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছে।

এ ছাড়া বাহরাইনে ৬৬ হাজার ১৫৯ দশমিক ৮৫ ডলার, মালদ্বীপে ৫৯ হাজার ৪৩৯ দশমিক ৭৮ ডলার, বেনিনে ২৪ হাজার ৫৭৪ দশমিক ৯২ ডলার, ব্রুনেইয়ে ২১ হাজার ৯০৭ দশমিক ১১ ডলার, কাতারে ৮ হাজার ৪০৪ দশমিক ১১ ডলার এবং কুয়েতে ৭ হাজার ৪২০ দশমিক ৭০ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়ায় সর্বোচ্চ ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭ দশমিক ১৩ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছিল। নেপালে রপ্তানি হয়েছিল ২৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩০৩ দশমিক ১১ ডলারের আলু। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭ দশমিক ২৭ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪০ দশমিক ২৪ ডলার, সিঙ্গাপুরে ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৮ দশমিক ২৫ ডলার এবং মিয়ানমারে ৫ লাখ ৭ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৪৩ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছিল।

এ ছাড়া ওই অর্থবছরে সৌদি আরবে ৩ লাখ ২১ হাজার ৬২ দশমিক ৮৩ ডলার, বাহরাইনে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৮৮ দশমিক ৬১ ডলার, ব্রুনেইয়ে ৯৪ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৪৩ ডলার, কাতারে ১৯ হাজার ৮১৩ দশমিক ২৬ ডলার, মালদ্বীপে ১৩ হাজার ৩৬০ দশমিক ৩২ ডলার এবং কুয়েতে ৮ হাজার ৩৬৯ দশমিক ১৩ ডলারের আলু রপ্তানি হয়।

রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ এবং ইপিবির পর্যবেক্ষণ জানতে সংস্থাটির চট্টগ্রাম অফিসের উপপরিচালক সুবল চাকমা বলেন, এ বিষয়ে তাদের নিজস্ব কোনো ব্যাখ্যা বা মতামত নেই। বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করাই তাদের কাজ। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক সংঘাত ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনে বাংলাদেশের আলুর আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা আরও কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বাজার তৈরি এবং বিদ্যমান বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পরিবহন ব্যয় কমানো ও রপ্তানি সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৫৪ হাজার ৫২৭ দশমিক ১০৯ মেট্রিক টন আলু রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ২৯ হাজার ৫৬০ দশমিক ২৯৭ মেট্রিক টনে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে ১১ হাজার ১৭৯ দশমিক ৬৬০ মেট্রিক টনে নেমে আসে।তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪০ হাজার ৫৪২ দশমিক ৯২৯ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরের অর্থবছরেই রপ্তানি আবার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।