Spread the love

বিশেষ প্রতিনিধি:

বর্ষার বিদায়লগ্ন ও শরতের শুরুতে বাংলাদেশ এক অদ্ভুত ও বিপরীতমুখী প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে দেশজুড়ে চলছে জলবায়ু প্ররোচিত অস্বস্তিকর তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে উজানের নদ-নদী থেকে নেমে পানিতে বন্যা পরিস্থিতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। আবহাওয়াবিদ, কৃষি ও নদী গবেষকদের মতে, এই ত্রিমুখী চাপ দেশের কৃষিভিত্তিক জনপদগুলোকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

চলতি মৌসুমে শরৎকালের প্রাক্কালেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা বজায় রয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা একে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে দেখছেন। অতিরিক্ত এই তাপমাত্রার কারণে ফসলের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে:

অতিবৃষ্টিতে ক্ষতি হচ্ছে বিভিন্ন বীজতলার। সবজি চাষে দেখা যাচ্ছে নানা সমস্যা।তীব্র গরমে খরাভাব তৈরি হওয়ায় কৃষকদের ফসল আবাদে অতিরিক্ত সেচ দিতে হচ্ছে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মূলত অববাহিকার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় উজানের যেকোনো জলবায়ু পরিবর্তন বা কৃত্রিম পানি ব্যবস্থাপনার সরাসরি প্রভাব এখানে পড়ে।

নেপালের আকস্মিক বন্যা এবং ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি সামাল দিতে ফারাক্কা ব্যারাজের গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গঙ্গা ও পদ্মার পানিস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

এই অতিরিক্ত জলরাশি ও স্থানীয় বৃষ্টির ফলে রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জেলার চরাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরের শত শত হেক্টর ধান, শাকসবজি  পানিতে তলিয়ে গেছে। আকস্মিক এই বন্যায় গো-খাদ্যের তীব্র সংকট এবং নদী ভাঙন কৃষকদের নিঃস্ব করে তুলছে।

আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি করেছে:

শরতের এই অসময়ে আকস্মিক বন্যায় স্থানীয় পর্যায়ে শাকসবজি ও খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নদীর পানি হুট করে বেড়ে যাওয়ায় এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত গরমে পুকুর ও জলাশয়ের জলীয় মানে পরিবর্তন আসায় মৎস্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা মোকাবিলায় কেবল জাতীয় পর্যায় নয়, বরং আঞ্চলিক বা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর ‘আগাম সতর্কবার্তা বিনিময় ব্যবস্থা’ (Early Warning System) গড়ে তোলা জরুরি। উজান থেকে পানি ছাড়ার তথ্য বা নেপাল-ভারতের অববাহিকার বৃষ্টির ডেটা দ্রুত বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে পারলে ফসলের আগাম সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

তাপপ্রবাহের তাপদাহ এবং উজানের আকস্মিক বন্যার এই দ্বিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের কৃষি খাত আজ মারাত্মকভাবে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতি উত্তরণে খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ এবং টেকসই পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।