Spread the love

ভাইরাল ‘দুবাই চকলেট বারে’র আকাশছোঁয়া চাহিদায় বিশ্ববাজারে পেস্তাবাদামের জোগানে টান পড়েছে, যার ফলে হু হু করে বাড়ছে এর দাম। কারণ, এই চকলেট তৈরিতে প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিমাণে পেস্তাবাদাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে সেই ভাইরাল দুবাই চকলেট এখন হাজির হয়েছে বাংলাদেশেও। দেশের বাজারে এর কোনো কমতি না থাকলেও দাম কিন্তু বেশ চড়া!


পেস্তা-ক্রিম ও খাস্তা কুনাফার এই অপূর্ব যুগলবন্দি অবশ্য রাতারাতি বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলেনি। ২০২৩ সালের শেষের দিকে এটি প্রথম নজর কাড়তে শুরু করে। দুবাইয়ের স্থানীয় প্যাস্ট্রি শপ ‘ফিক্স ডেজার্ট চকোলেটিয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সারাহ হামৌদা প্রথম এই চকলেট তৈরি করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে টিকটকের অ্যালগরিদমে এর একটি ‘এএসএমআর’ ভিডিও ভাইরাল হয়। চকলেটের খোলস ভাঙার মচমচে শব্দ এবং ভেতরে ঘন পেস্তা-কুনাফার লোভনীয় পুরের সেই ভিডিও কয়েক মিলিয়ন মানুষ দেখার পরপরই বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে।


সেই ভিডিওর রেশ ধরে ট্রেন্ডটি দ্রুত বিশ্ববাজার পেরিয়ে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের অলিগলি, অনলাইন শপ ও ক্যাফেগুলোতে। দাম চড়া হলেও ভোজনরসিকরা কিন্তু পিছু হটছেন না। পিকআপ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পাতলা সবুজ-সোনালি বাক্সের জন্য ২,৪০০ টাকা গুনতেও অনেকে দ্বিধা করছেন না। আবার শহরের অন্য প্রান্তে গিয়ে ৩,৫০০ টাকারও বেশি খরচ করে ‘অরিজিনাল দুবাই চকলেট’ কিনছেন চকলেটপ্রেমীরা। অন্যদিকে কম বাজেটের ক্রেতারা বেছে নিচ্ছেন দেশীয় ও স্থানীয় বিকল্প, যার পেস্তা-কুনাফার পুর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি তোলার জন্য বেশ চমৎকার! মজার বিষয় হলো, এই বিপুল কেনাবেচার সঙ্গে দুবাই যাওয়ার কোনো সংযোগই নেই।


চকলেটের এই আকাশছোঁয়া চাহিদার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী পেস্তার বাজারে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বেকারি ও হোম-বেকারদের চকলেট তৈরির প্রতিযোগিতায় পেস্তার সংকট দেখা দেয় এবং লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে সরাসরি পাইকারি বাজারে এই ঘাটতি তেমন স্পষ্ট না হলেও চকলেটের চড়া দামে তা সহজেই অনুমেয়। অনলাইনে ‘অরিজিনাল দুবাই চকলেট’ ৪৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩,৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যার চোখধাঁধানো মোড়ক অনেক সময় চকলেটের উৎসকে ছাপিয়ে অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
তবে এই জনপ্রিয়তা এখন আর কেবল চকলেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্যাফেগুলোতে এখন দেদার বিক্রি হচ্ছে কুনাফা চিজকেক, পেস্তা-ক্রিম ওয়াফেল, কুনাফা ক্রোয়াসাঁ, মিল্কশেক, ব্রাউনি এবং স্পেশাল কফি। এর পাশাপাশি ফেসবুক ও টিকটকভিত্তিক অসংখ্য ক্ষুদ্র অনলাইন কিচেন হোম ডেলিভারির মাধ্যমে দেশজুড়ে নিজেদের ব্যবসা জমিয়ে তুলেছে।
বাজারের এই উন্মাদনায় সামিল হতে পিছিয়ে নেই দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোও। যেমন পোলার আইসক্রিম মাত্র ১৫০ টাকায় তাদের নতুন ‘কুনাফা আইসক্রিম’ বাজারে এনেছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে বেশ সাশ্রয়ী। অন্যদিকে ‘বেস্টো’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আসল স্বাদের খোঁজ করা ক্রেতাদের জন্য সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কুনাফা বার আমদানি করছে। এমনকি মার্স, গ্যালাক্সি, লিন্ডট ও মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও বাজারে এনেছে তাদের নিজস্ব সংস্করণ।
এই চকলেটের মূল আকর্ষণ খুবই সরল, বাইরে মচমচে চকলেটের আবরণ, আর ভেতরে রিচ পেস্তা-ক্রিমের সঙ্গে ভেজে রাখা খাস্তা কুনাফার চমৎকার ভারসাম্য। তবে কমদামি ও নকল সংস্করণ নিয়ে কিছুটা অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। যারা আগে আসল স্বাদ পরখ করেছেন, তাদের মতে অনেক স্থানীয় প্রস্তুতকারক খাঁটি ‘কাতাইফি’ পেস্ট্রির বদলে সাধারণ লাচ্ছা বা বাংলা সেমাই ব্যবহার করছেন, যার ফলে চকলেটটির আসল টেক্সচার ও অনন্য স্বাদ নষ্ট হচ্ছে।
খাবারের জগতে নতুন ট্রেন্ড আসা কোনো নতুন ঘটনা নয়, তবে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার অবিশ্বাস্য গতি। এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কোনো খাবার টিকটকের ডিজিটাল পর্দা থেকে সরাসরি ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। আর দশটা ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ডের মতো দুবাই চকলেট কিন্তু বাতাসে মিলিয়ে যায়নি; বরং ক্যাফে ও ডেজার্টের দুনিয়ায় এটি একটি স্থায়ী পদ হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে।