কৃষির রূপান্তরে ও বৈচিত্র্যকরণে আধুনিক যন্ত্রাংশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে আধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহার দিন দিন বাড়লেও এখনো পিছিয়ে স্থানীয় কৃষকরা। আর্থিক সক্ষমতা না থাকা ও পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধার অভাব কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বড় বাধা। দেশের কৃষকের মাত্র ২ শতাংশের নিজস্ব কোনো যন্ত্র রয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশই ভাড়ায় কৃষি যন্ত্র ব্যবহার করেন। আর কৃষি যন্ত্রাংশ ক্রয়ে কৃষকের ঋণের মাত্র ২-৭ শতাংশ আসে ব্যাংক থেকে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

রাজধানীর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) গত সোমবার ( ১২ অক্টোবর) ‘বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় অর্থায়ন: প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নীতি সংলাপ’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে আইএফপিআরআই ও বিআইডিএস।

প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো ড. এম মেহরাব বখতিয়ার বলেন, ‘২০১৮ সালে বাংলাদেশে কম্বাইন হারভেস্টারে ফসল কাটার হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৩ সালে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দেশের কৃষকের মাত্র ২ শতাংশের নিচে কৃষি যন্ত্রাংশ যেমন পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের মতো যন্ত্রাংশ। বাকি কৃষকরা ভাড়ায় যন্ত্রাংশ এনে ব্যবহার করেন।’

আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো জানান, প্রতি ১০০ জন কৃষকের মধ্যে ৯৮ জনই ভাড়ায় ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। পাওয়ার টিলার ভাড়ায় ব্যবহার করেন ৯৫ শতাংশ। প্রতি ১০০ জন কৃষকের মধ্যে মাত্র ৬ জনের নিজস্ব থ্রেশার মেশিন রয়েছে। সেচের জন্য নিজস্ব টিউবওয়েল আছে ১৪ শতাংশ এবং পাওয়ার পাম্প আছে ১৬ শতাংশ কৃষকের। বাকিরা ভাড়ায় ব্যবহার করেন। এ ভাড়ার বার্ষিক আয় ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
আইএফপিআরআইয়ের জরিপে দেখা গেছে, একটি ট্রাক্টর গড়ে ২৮৫টি ফার্ম, একটি হারভেস্টর গড়ে ১৭০টি ফার্ম এবং প্রতিটি পাওয়ার টিলার ৭০টি ফার্মের সেবা প্রদান করে। অন্যদিকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কিংবা কৃষকের নিজস্ব যন্ত্রাংশ না থাকার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থায়নের সুবিধা কম থাকার কথা উঠে আসে। যদিও কয়েক বছর ধরে সরকার ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে।
আরেক উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ঋণে কৃষির অংশ ২৫ থেকে ১৬ শতাংশে নেমেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রথাগত কৃষির বাইরে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকশিত ও রূপান্তর হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের ৪০ শতাংশই ব্যয় করে ঋণের কিস্তি পরিশোধে। এ সময়ে দরিদ্র ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের ফার্ম লোনের ৪৪-৫৬ শতাংশই যায় সার কিনতে, বীজে ৩৫-৪৫ এবং জমি লিজে ব্যয় হয় ১০-১৪ শতাংশ। এছাড়া আরো বলা হয়, দেশের গবাদিপশুর ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র খামারিরা উৎপাদন করেন। এর পরও এ খাতে যাচ্ছে কৃষি ঋণের ৫ শতাংশের কম। ফলে মুনাফার বড় সুযোগ থাকার পরও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানান, সরকার কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দেশের ৪১ শতাংশের বেশি শ্রমশক্তি কৃষিতে যুক্ত। কিন্তু কৃষিকাজে আমরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ধান কাটার সময় ১-২ হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।’





