Spread the love

গরু-মহিষের কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি দুর করে উন্নতমানের পশু জন্ম দিতে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য তৈরি করা বাংলাদেশ প্রাণী প্রজনন আইনের খসড়ায় বুল স্টেশন, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, আইভিএফ ল্যাব ও সিমেন ব্যাংকের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ষাঁড় থেকে বাণিজ্যিকভাবে সিমেন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে নিষিদ্ধ এবং এক্ষেত্রে আইন লংঘনের জন্য ৫ বছরের কারাদন্ড ও র্অথদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ প্রাণী প্রজনন আইন-২০২৬’- শিরোনামের প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ১৭ সদস্যের একটি ‘জাতীয় কারিগরি নিয়ন্ত্রক কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ছাড়াও নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং প্রজনন বিশেষজ্ঞগণ থাকবেন।

কেন প্রয়োজন এমন আইনের ?

দেশে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি গবাদি পশু পালন করায় দেশ এখন মাংস ও দুধ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)-তে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১৬.৫৪ শতাংশ।  গ্রামীণ জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গবাদি পশু পালন বড় ভূমিকা রাখছে।

গবাদি পশু পালন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশে বর্তমানে প্রজনন ষাঁড় নির্বাচন, সিমেন উৎপাদন, ভ্রূণ স্থানান্তর, ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ), জিনোমিক নির্বাচন, জাত নিবন্ধন, জেনেটিক মূল্যায়ন, ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি এবং কৃত্রিম প্রজননসহ ইত্যাদি সহায়ক প্রযুক্তিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর আইন নেই। ফলে, বর্তমানে গবাদি পশুর বংশগত উন্নয়ন এবং নিরাপদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন নিশ্চিত করাটা কঠিন।

গবাদি পশু পালনকে নিরাপদ ও প্রকৃতি বান্ধব করে একদিকে যেমন গবাদি পশুর বংশগত বা জেনেটিক মান উন্নত করা দরকার, তেমনি জলবায়ু পরির্বতনের ক্ষতি মোকাবেলায় সক্ষম নতুন গবাদি পশুর জাত উন্নয়ন করা প্রয়োজন। নতুন আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের ফলে আগামীতে দেশে উন্নত জাতের গবাদি পশু পালন বৃদ্ধির পাশাপাশি, দেশিয় জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ সম্ভব হবে বলে মনে করে সরকার।

আইনের মূল্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

খসড়া আইন অনুযায়ী, বৈধ নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গবাদি পশুর সিমেন, ভ্রূণ কিংবা ডিম্বাণুর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি বা কেনা-বেচা করতে পারবে না। সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিবন্ধিত সেবার ধরন বা গুণগত মান নিয়ে বিভ্রান্তিকর কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না।        অনুমোদন ছাড়া কোনো বুল স্টেশন, ভ্রূণ প্রতিস্থাপন কিংবা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) ল্যাবরেটরি স্থাপন ও পরিচালনা করা যাবে না। কৃত্রিম প্রজনন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘এআইটিআই’ এবং গবাদি পশুর প্রজননে সহায়কের ভূমিকা রাখা সব ধরনের প্রযুক্তি ‘এআরটি’ সেবা প্রদানকেও যথাযথ কতৃপক্ষের নিবন্ধন নিতে হবে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সিমেন ব্যাংক স্থাপন করতে পারবে। সংরক্ষিত সব সিমেনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বা মুদ্রিত রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে নিবন্ধিত বুল স্টেশনে ব্যবহৃত সব প্রত্যয়িত ষাঁড়ের সিমেনের নির্দিষ্ট পরিমাণ নমুনা জিন ব্যাংকে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল, জৈবনিরাপত্তা, প্রাণীকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক পরীক্ষাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

আইনে বলা হয়েছে নিবন্ধিত সেবার মিথ্যা তথ্য প্রচার, নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ প্রজনন উপকরণ বিক্রি, দেশীয় প্রজনন সম্পদ পাচার কিংবা ডিএনএ তথ্য বিকৃত করলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে । ভুল তথ্য বা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিবন্ধন নিলে, নিবন্ধন সনদের শর্ত ভাঙলে কিংবা আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করারও বিধান রাখা হয়েছে ।