Spread the love

আমদানি করা বিদেশি ফলের চেয়ে  চট্টগ্রামের ফলের বাজারে এখন দেশি ফলের দাপটই বেশি । পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙা, জাম্বুরা, বেল, কদবেল, আতা, পাইন্যাগুলা, লটকন, আনারস, পেঁপে ও তালের সরবরাহই বেশি বন্দরনগরীর বিভিন্ন বাজারে।  পাশাপাশি দেখা মিলছে মৌসুমী আখেরও।

নগরীর কাঁচাবাজার, অলিগলির ফলের দোকান কিংবা রাস্তার পাশের ভ্যানে— হাত বাড়ালেই মিলছে মৌসুমি এসব ফল। এর মধ্যেই আলাদা করে নজর কাড়ছে কয়েক বছর আগেও বাজারে তুলনামূলক কম দেখা যাওয়া পাইন্যাগুলা, লটকন, কদবেল, সফেদার মতো কিছু ফল। পার্বত্য জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে মিশ্র ফলের বাগান বাড়ায় এসব দেশি ফলের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তিন পার্বত্য জেলা থেকেও দেশি ফল আসছে মহানগরের বাজারে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসছে পাকা তাল, আখ আর কয়েক প্রজাতির ‘অসময়ের তরমুজ।’ এই সময়ে বাজারে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত সবুজ কমলা এবং স্থানীয়ভাবে ‘জ্বর-সর্দির মহৌষধ’ হিসেবে পরিচিত বিপন্ন প্রজাতির ‘কাটা জামির’ বা কাটা লেবু। চট্টগ্রামে ‘কাটা জাঁইর’ নামে পরিচিত দুষ্প্রাপ্য সাইট্রাস বা লেবু জাতীয় ফলটি এখন প্রায়ই বাজারে মিলছে।

চট্টগ্রামের ফলের দোকানগুলোতে মৌসুমি দেশি ফলের পসরা এখন বেশ সমৃদ্ধ। বড় বাজারের আড়ত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছোট দোকান, ফুটপাত ও ভ্যান— সবখানেই নানা ধরনের দেশি ফল সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অনেক ক্রেতাই নির্দিষ্ট কোনো ফল কিনতে না এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পছন্দের ফল বেছে নিচ্ছেন। কেউ কিনছেন পেয়ারা, কেউ আমড়া-কামরাঙা, আবার কারও হাতে দেখা যাচ্ছে লটকন কিংবা পাইন্যাগুলার প্যাকেট।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের মৌসুমে দেশি ফলের বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে লটকন, তাল ও পাইন্যাগুলা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে বাজারে আসছে। এসব ফল এক সময় বর্ষা মৌসুমে অল্প পরিমাণে পাওয়া গেলেও বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকত না। বিশেষ করে জাম্বুরা এবার গত দুই মাস ধরেই বাজারে সরবরাহ দেখা যাচ্ছে, এগুলো আরও দুই মাস মিলতে পারে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েক বছর ধরেই  চট্টগ্রামে দেশি  ফলের সরবরাহ বেড়েছে। এর পেছনে বড় একটি কারণ পার্বত্য জেলাগুলোতে মিশ্র ফলের বাণিজ্যিক চাষ বৃদ্ধি। পাহাড়ি এলাকায় একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের দেশি ফলের গাছ লাগানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এসব ফলের চারা সহজলভ্য হওয়া এবং বাজারে চাহিদা তৈরি হওয়ায় কৃষকরাও দেশি ফলের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহও বাড়ছে। একই কারণে দেশ থেকে প্রায়ই হারিয়ে যেতে বসা পাইন্যাগুলা, আমলকির মতো অনেক দেশি ফল নতুন করে বাজারে ফিরছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ফল ব্যবসায়িরা।

চট্টগ্রামের ফলের বাজারে প্রতি বছর এই সময়ের ‘নায়ক’ হয়ে উঠে জেলার চন্দনাইশ-পটিয়া অঞ্চলে উৎপাদিত ‘কাঞ্চন’ পেয়ারা। আকার ও স্বাদের কারণে স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যে এ পেয়ারার চাহিদা রয়েছে। কাঞ্চন পেয়ারা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এখন শহরের সর্বত্রই এই পেয়ারার বেচাকেনা চলছে হরদম। ফলটি সাধারণত ডজন হিসেবে বিক্রি হয়। আকারভেদে প্রতি ডজন কাঞ্চন পেয়ারার দাম ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।

 

মৌসুমি ফলের তালিকায় পাইন্যাগুলা-লটকন নতুন নয় কিন্তু এক সময় চট্টগ্রামের বাজারে এগুলো এতটা সহজলভ্য ছিল না। সপ্তাহখানেক বা মাসখানেক উঠতো, তারপর বাজার থেকে উধাও হয়ে যেতো। কিন্তু এবার চট্টগ্রামের বাজারে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে দেখা যাচ্ছে। দেশীয় এই ফলগুলো ঔষধিগুণ সম্পন্ন বলে চিকিৎসকরা প্রায়ই মানুষজনকে এসব খেতে উৎসাহিত করেন। সে কারণে মৌসুম এলে মানুষজন এসব কেনার দিকে ঝোঁকেন। বাজারে এখন লটকন ও পাইন্যাগোলা কেজি প্রতি ১৫০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

 

পেয়ারা, লটকন ও পাইন্যাগুলার পাশাপাশি বাজারে আমড়া ও কামরাঙ্গারও ভালো চাহিদা রয়েছে। বাজারে প্রতি ডজন আমড়া ও কামরাঙা ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এসব ফল লবণ-মরিচ দিয়ে ভিন্নস্বাদ নিয়ে খান। কেউ আবার কাঁচা ফল আচার বা ভর্তা তৈরির জন্যও নিয়ে যাচ্ছেন।

মৌসুমি ফলের বাজারে আনারসও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। আকার ও মানভেদে এক জোড়া আনারস ৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে তাল। পাকা তালের রস দিয়ে নানা ধরনের পিঠা তৈরি করা হয়। শৌখিন নারীরা তালের পিঠা বানানোকে শখ হিসেবেও দেখেন। মৌসুমের এই ফলটি নিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। চট্টগ্রামের বাজারে এখন আকার ভেদে প্রতিটি তাল ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

এ সময় বাজারে আরেকটি পরিচিত দৃশ্য আখের স্তূপ। প্রতিটি আখ ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

নগরের বিভিন্ন সড়কের পাশে ভ্যান ও ছোট দোকানে আখ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অনেকে বাড়িতে যাওয়ার সময় একসঙ্গে কয়েকটি আখ কিনছেন। রাস্তার পাশে ভ্যানে ফল পাওয়া যাওয়ায় বাজারে ঢোকার ঝামেলা ছাড়া অফিস বা কাজ শেষে ফেরার সময় অনেকেই প্রয়োজনমতো ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

বাসসের সৌজন্যে