Spread the love

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিংড়ি উৎপাদন কেন্দ্র বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় এবার চিংড়ির রেণুর (পোনা) ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। ঘেরে রেণু ছাড়ার মৌসুম প্রায় শেষ হতে চললেও চাষিরা চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেণু সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে হাজার হাজার ঘের প্রস্তুত রাখলেও, পোনা ছাড়তে না পেরে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় খামারিরা।

এক সময় চিংড়ির রেণুর সরবরাহ ও বেচাকেনায় মুখর থাকা ফকিরহাটের ফলতিতা ও আশপাশের বাজারগুলো এখন প্রায় ক্রেতাশূন্য। বাজারে পর্যাপ্ত রেণু নেই, আর যা-ও পাওয়া যাচ্ছে তার দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১,৩০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ৩,০০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত তিনটি কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।  প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং মৎস্য বিভাগের নিয়মিত অভিযান। মান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জটিলতায় অঞ্চলে হ্যাচারির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে হ্রাস পাওয়া (২০১১-১২ সালের ৭৮টি হ্যাচারি কমে বর্তমানে মাত্র ৩৭টিতে নেমে এসেছে) এবং হ্যাচারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাওয়া।

এর ফলে চাষিরা এখন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা ও পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক রেণু এবং সীমান্ত অঞ্চল থেকে আসা পোনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তবে সেখান থেকেও কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ মিলছে না। অনেক ব্যবসায়ী কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে লাখ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েও পোনা পাচ্ছেন না।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ৮ হাজার ৪টি ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণুর চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় চাষী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি—চলতি মৌসুমে উপজেলাজুড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রেণুর প্রয়োজন। বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ রয়েছে চাহিদার মাত্র ৮ থেকে ১৫ শতাংশ।

ফকিরহাটের ফলতিতা বাজারে ৫ শতাধিক মাছের আড়ত রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। এই বাজার এবং উপজেলার প্রায় ২০ হাজার বাণিজ্যিক ঘের ও পুকুরকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা জড়িত। রেণু সংকটের কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে ফকিরহাটে ২,৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৪৩০ টন। তবে মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 ফকিরহাটের জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ জানান, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু আহরণ নিষিদ্ধ হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে হ্যাচারি-নির্ভর চাষ সম্প্রসারণে চাষিদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় এই সংকট কাটাতে কিছুটা সময় লাগবে।

স্থানীয় চিংড়ি চাষিদের মতে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে যদি রেণুর সরবরাহ স্বাভাবিক করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

(ক্ষেতে পাতে ডেস্ক)