Spread the love

 

 

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের বিচারে কৃষি এখনও দেশের সর্ববৃহৎ ব্যক্তিগত খাত। তবে এই খাতের অন্যতম প্রধান একটি চ্যালেঞ্জ হলো সেচ ব্যবস্থার উচ্চ খরচ ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা। বর্তমানে দেশের সেচ ব্যবস্থার প্রায় ৬০ শতাংশ খরচই চলে যায় ডিজেলে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের এই সময়ে কৃষিকে লাভজনক করতে হলে প্রথাগত সেচ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ হতে পারে এক নতুন সম্ভাবনা। তবে শুল্ক ছাড় বা শুধু প্রযুক্তি দিলেই হবে না, কৃষকের মাঠ পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে প্রয়োজন একটি টেকসই ‘বিজনেস মডেল’। বাজেট-পরবর্তী এক নাগরিক সংলাপে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শরমিন্দ নিলোর্মি কৃষির এই রূপান্তর ও সংকট নিয়ে একটি টেকসই ‘বিজনেসমডেল’ এর প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শুধু শুল্কছাড় বা প্রযুক্তি দিলেই হবে না, কৃষকের মাঠপর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাতে প্রয়োজন ।

কৃষি ভ্যালুচেইন  মধ্যস্বত্বভোগী সংকট

নিরাপত খাদ্য ও নিরাপদ কৃষি বিষয়ক নিউজ পোর্টাল “ ক্ষেতে-পাতে “ এর আয়োজনে নাগরিক সংলাপে অধ্যাপক অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মি জানিয়েছেন কৃষিখাতের ভ্যালুচেইন ম্যাপিংয়ে পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর বিষয়টি অনুপস্থিত থাকে। তিনি বলেন প্রচলিত ধারণায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কেবলই ‘শোষক’ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তথাকথিত এই মধ্যস্বত্বভোগীরা মূলত এক ধরনের বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে আসেন। এই ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক ঝুঁকিটি হলো ‘চাঁদাবাজি’। যদি বাজার থেকে চাঁদাবাজি  প্রতিহত করা যায়, তবে মধ্যস্বত্বভোগী থাকলেও কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হবেন।

সৌরবিদ্যুতের সেচব্যবস্থায় প্রণোদনা

এবারের বাজেটে সৌরবিদ্যুতের সেচের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আমদানির পর্যায়ে বড় ধরনের শুল্কছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো সৌরসেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত খাতের উদ্যোক্তাদের এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। তবে এই রাষ্ট্রীয় সুবিধার শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে গ্রামীণ অর্থনীতি উপযোগী ব্যবসায়িক মডেল দরকার বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতির এই গবেষক ।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সেচব্যবস্থায় ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ৬০ শতাংশই হলো ডিজেল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের এই সময়ে কৃষিকে লাভজনক করতে হলে প্রথাগত সেচব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। কৃষকরা যদি সমবায় বা যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ‘কমান্ড এরিয়া’ নির্ধারণ করে আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইনের সাহায্যে সৌরসেচ ব্যবহার করতে পারেন, তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

কেমন হওয়া উচিত কৃষকের ‘বিজনেসমডেল’?

ব্যক্তিপর্যায়ে শুল্কছাড়ের সুবিধা পুরোপুরি মাঠের কৃষকের পকেটে পৌঁছানোর জন্য একটি কার্যকর আর্থিক মডেল প্রয়োজন। অধ্যাপক নিলোর্মির প্রস্তাবনা অনুযায়ী মডেলটি হওয়া উচিত,সহজ ঋণ ও উৎপাদনভিত্তিক পরিশোধ এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির ব্যবস্থার বিধানসহ । তিনি বলেন “ কোনো কৃষক বা গ্রামীণ উদ্যোক্তা যদি সৌরসেচের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঋণ নেন, তবে সেই ঋণের কিস্তি যেন সহজ হয়। ফসল কাটার পর বা সরাসরি উৎপাদনের আয়ের মাধ্যমে যাতে তা সহজে পরিশোধ করা যায়, সেই ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। “

সারা বছর জমিতে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বছরের যে সময়গুলোতে সেচ বন্ধ থাকবে, সেই অলস সময়ে সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বাড়তি সৌরবিদ্যুৎ যাতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়, সেই সুযোগ ও সহজ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। এর ফলে কৃষকের সেচপাম্পটি আর কেবল খরচের খাত থাকবে না, বরং বছরজুড়ে উপার্জনের একটি স্থায়ী উৎসে পরিণত হবে।

অধ্যাপক শরমিন্দ  নিলোর্মির মতে, সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি প্রতিটি গ্রামীণ কমান্ড এরিয়াকে স্বাবলম্বী করা যায়, তবে প্রান্তিক কৃষকরা কেবল ফসলের উৎপাদন খরচই কমাবেন না, বরং নিজেরা একেকজন ‘জ্বালানি উদ্যোক্তা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন।

শাঁওলি সুমন