ইরানে হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থা আরও কয়েক দিন চললে আসন্ন মৌসুমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত ও পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বে সার তৈরির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাঁচামাল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু সংঘাতের কারণে গত কয়েক দিন ধরে কৃত্রিম সারের প্রধান উপাদান অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এর মতে, বিশ্বের মোট খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই নির্ভর করে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর। সার না থাকলে ফসলের উৎপাদন কমে যাবে। এর ফলে অঞ্চলভেদে আলু, রুটি ও পাস্তার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি পশুখাদ্যের খরচও বেড়ে যাবে।
রাশিয়া, মিসর ও সৌদি আরবের পর ইরান বিশ্বে ইউরিয়া রপ্তানিতে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। ইউরিয়া হলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেনভিত্তিক সার। আবার নাইট্রোজেন সার তৈরির মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় জীবাশ্ম গ্যাসের পেছনে। উপসাগরীয় অঞ্চলে জীবাশ্ম গ্যাসভিত্তিক কয়েকটি প্লান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক নাইট্রোজেন সরবরাহ আরও ধাক্কা খেতে পারে। ড্রোন হামলার পর কাতার এরই মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় একটি স্থাপনা বন্ধ করে দিয়েছে।
গার্ডিয়ান বলছে, বিশ্ববাজারে সারের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা চালানোর পরও এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে মিসরের ইউরিয়ার দামকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ধরা হয়। সেটি বর্তমানে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন ইউরিয়ার দাম বর্তমানে ৬২৫ ডলার। গত সপ্তাহে যা ছিল ৪৮৪ থেকে ৪৯০ ডলারের মধ্যে।
সিআরইউর বিশ্লেষক ক্রিস লসনের মতে, বৈশ্বিক সালফার বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এটি সার উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। পাশাপাশি বিভিন্ন ধাতু ও শিল্প রাসায়নিকের বড় একটি অংশও এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ হয়। ২০২২ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে অনেক মিল থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব অনেক বেশি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল দুই সপ্তাহের বেশি সীমিত থাকলে সরবরাহ ও চাহিদার শৃঙ্খল ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
জনবহুল হওয়ায় পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে (দক্ষিণ এশিয়া) বপন মৌসুমের আগে সারের কেনাবেচা বেড়ে যায়। সরবরাহ কয়েক সপ্তাহ দেরি হলেই সমস্যার সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হলে বেশি দামে সার কেনা, কম ব্যবহার এমনকি কোন ফসল উৎপাদন করা হবে, তা নিয়ে বিপাকে পড়তে পারেন চাষিরা।
গবেষণামূলক নিবন্ধের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশনের বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, নাইট্রোজেনের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফলনে তুলনামূলকভাবে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কয়েক মিলিয়ন টন ফসল উৎপাদন কমে যাবে। পরে ধাপে ধাপে প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে। যেমন– পশুখাদ্যের বাজার, গবাদি পশু উৎপাদন, বায়োফুয়েল শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা খাদ্যপণ্যের দামে।
ইরানের হামলার কারণে জ্বালানি তেলের প্রভাবে যেমন সেচ সঙ্কট দেখা দিতে পারে, আবার সারের সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সবাই।



