
তরমুজের বাইরেটা সবুজ আর ভেতরটা লাল। এটাই জানা ছিল এতোদিন। কিন্তু। সবুজ তরমুজ কাটলে যে এমন হলুদ রঙ দেখা যাবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলো অনুমানের বাইরে। কেবল রূপেই নয়, স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় এই ‘ইয়েলো ড্রাগন’ চাষেই এখন ভাগ্য বদলেছে সাতক্ষীরার কৃষকদের। সাতক্ষীরার সমতল ও মৎস্য ঘেরের উঁচু বেড়িবাঁধে অমৌসুমী ‘ইয়েলো ড্রাগন’ ও ‘কার্নিয়া’ জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় চাষীরা।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া, ভায়ড়া ও শুকদেবপুর গ্রাম। চোখ জুড়ানো মাচায় সারি সারি ঝুলছে হলুদ রঙের তরমুজ।৩ গ্রামের ২৮ জন চাষী একই এলাকায় ২১ বিঘা জমিতে ইয়েলো ড্রাগন ও কার্নিয়া জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করে এখন স্বাবলম্বী। বর্ষার পানিতে জমি ভেজা থাকলেও বিশেষ ‘মালচিং’ প্রযুক্তির কারণে বাঁচে সার ও কীটনাশক, কমে ঘাসের উপদ্রব।

বর্ষাকালীন এই হলুদ তরমুজ চাষ করে বেশ লাভবান সাতক্ষীরার চাষীরা। এবার অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও কোনো লোকসান হবে না। রাজধানীর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফড়িয়ারা এসে ক্ষেত থেকেই কেজি প্রতি ৪৫-৫০ টাকায় নগদ মূল্যে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মাত্র ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে হলুদ তরমুজ তোলার আগেই একই ক্ষেতে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা হচ্ছে চিচিঙ্গা, করলা ও শসা। মাচায় ঝুলন্ত এসব তরমুজ যাতে ছিঁড়ে না পড়ে, সে জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ নেট ব্যাগ। সারি সারি ঝুলন্ত তরমুজের দৃশ্য যেমন মনোরম, স্বাদে ও গুণমানেও এটি অতুলনীয়। চাষীরা বলছেন হলুদ তরমুজ খেতে খুব সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর দারুণ চাহিদা। তরমুজের সাথে সাথী ফসল চাষ করায় বাড়তি মুনাফাও পাচ্ছেন তারা ।

কৃষকরা জানিয়েছেন মালচিং করার পরে ঘাস হয় না মোটেই,তাই সার-মাটি কম লাগে । এই তরমুজ চাষে কেবল পুরুষ চাষীরাই নন, সংসারের কাজের পাশাপাশি বিষমুক্ত এই ফসল উৎপাদনে হাত বাড়িয়েছেন গৃহিণীরাও। সাতক্ষীরার উপকূলীয় ঘেরের বেড়িবাঁধ ও অনাবাদী জমি এখন আর পড়ে থাকে না। মালচিং ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক বিঘা জমিতে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচে উৎপাদন হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার তরমুজ।

আর তরমুজ বিক্রি নিয়েও নেই কোনো ঝামেলা। অসময়ের এই তরমুজ কিনতে ঢাকা ও খুলনা থেকে বেপারিরা সরাসরি চলে আসছেন কৃষকের দোরগোড়ায়। ১ কেজির ওপরের ‘এ গ্রেড’ তরমুজ প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং তার নিচের আকারের তরমুজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে মাঠ থেকেই নগদ টাকায় কিনে নিচ্ছেন পাইকাররা। সরকারি সংস্থা পিকেএসএফ-এর সহায়তায় ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’ নামের স্থানীয় এনজিও কৃষকদের বীজ, মালচিং ও ফাঁদ দিয়ে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন উন্নয়ন প্রচেষ্টার সমন্বয়কারি কৃষিবিদ নয়ন হোসেন ।

সাতক্ষীরাতে এবার ২১ বিঘা জমিতে ২৮ জন কৃষক হলুদ তরমুজ চাষ করেছেন। এখানে প্রায় ৪২ টনের মতো তরমুজ উৎপাদিত হবে, যার বাজার মুল্য প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা। মালচিং পদ্ধতিতে অমৌসুমী তরমুজ করায় অবস্থা ভালো আছে। কৃষি বিভাগের র্কমর্কতারা আশা করছেন কৃষকেরা লাভবান হবেন এবার।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দুই বছর আগে শুরুতে ৩৬ থেকে ৬০ হেক্টর জমিতে এই অমৌসুমী বর্ষাকালীন হলুদ তরমুজ চাষ হয়েছিল। সেখানে চলতি বছর ইতিমধ্যেই ১০৮ হেক্টর জমিতে এর চাষ সম্পন্ন হয়েছে, যা মৌসুম শেষে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে বিঘা প্রতি গড়ে ২ থেকে আড়াই টন পর্যন্ত তরমুজ উৎপাদিত হচ্ছে। অসময়ে উৎপাদিত হওয়ায় বাজারে এটি বিক্রিতেও কোনো ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না চাষীদের। এমন মত সাতক্ষীরা খামারবাড়ির উপপরিচালক সাইফুল ইসলামের ।




