
বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন তো শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর ধরে। পরিবর্তন এত নীরবে ঘটেছে যে আগে সেটা চোখে পড়ত না। এখন মধ্যবিত্তের খাবারের বদলে যাওয়া তালিকা দৃশ্যমান। গত দুই দশক ধরেই বাঙালির পাতে ভাতের পরিমাণ কমছে। তবে তা উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রেই। চাকরিজীবীরা ওয়ার্কিং আওয়ারে ভাত খেতে চান না।বিশেষ করে যারা বসে কাজ করেন, তাদের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। একটু সালাদ, একটা ফল, শশা, কলা, ডিম, বেশি হলে একটি স্যান্ডউইচ। বলতে গেলে কর্পোরেট জীবনে এই চিত্র দেখা যাবে প্রায় জায়গায়ই।

একুশ শতকের শুরুতেও সাধারণ বাঙালির দুপুরের খাবারে বরাদ্দ থাকত ভাত, ডাল, শাক, মাছ বা মুরগি বা রেড মিট। প্রায় সব বাঙালিই বলত, ভাত না খেলে যেন শরীরে শক্তি পাওয়া যায় না। মাছে-ভাতে বাঙালি- র চিরচেনা উপমায় এসেছে পরিবর্তন। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) টানা দেড় দশকের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES) বলছে, ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশিদের দৈনিক গড় ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। দুই দশক আগে যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দিনে গড়ে ৪৪০ গ্রামের মতো ভাত খেতেন, এখন তা নেমে এসেছে ৩২৯ গ্রামের ঘরে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে রকমারি ফলমূল, রঙিন শাকসবজি আর প্রাণিজ আমিষ।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ফল খাওয়ার অভ্যাসে। গত দুই দশকে মাথাপিছু ফল গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। খাদ্যতালিকায় আলু আর মাছকে পেছনে ফেলে ফলের অবস্থান এখন ওপরের সারিতে। পাশাপাশি পাতে বেড়েছে ডিম, গরুর মাংস এবং বিশেষ করে হাঁস-মুরগির মাংসের উপস্থিতি। ব্রয়লার ও ফার্মের মুরগির সহজলভ্যতা প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে প্রধানত তিনটি কারণ- আয়ের প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসচেতনতা। মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার ধরন বদলেছে। কায়িক পরিশ্রমের পেশা থেকে মানুষ যত বেশি সেবামূলক ও মানসিক পরিশ্রমের পেশায় যুক্ত হচ্ছে, তত কার্বোহাইড্রেটের প্রয়োজনীয়তা কমছে। শহরের জীবনযাপনে ক্যালরি ঝরানোর উপায় কম থাকায় সচেতন মানুষ নিজেই ভাতের পরিমাণ কমিয়ে আমিষ ও শাকসবজি বাড়াচ্ছেন। তাছাড়া, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। অতীতে পরিবারের বাজেটের বড় অংশ খরচ হতো শুধু চাল-ডাল কিনতে। এখন খাদ্যের পেছনে ব্যয়ের অনুপাত কমেছে, আর মানুষ বেশি খরচ করছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও ভ্রমণের পেছনে।




