
ক্ষেতে পাতে ডেস্ক। ৪ জুলাই, ২০২৬
চলতি ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে তীব্র রূপ নেওয়া আবহাওয়া পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ (El Niño)-র সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট এই জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় দেশের কৃষি খাত এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়া ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা। চলতি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা দেশের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং প্রাণিসম্পদ খাতকে বড় ধরনের ওলটপালটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আমন ও আউশ চাষে বড় ধাক্কা, কমছে ফলন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, এল নিনোর প্রভাবে এবার দক্ষিণ এশীয় মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভরা বর্ষা মৌসুমেও দেশে অনিয়মিত ও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হচ্ছে। বৃষ্টিহীন এই দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতির কারণে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আউশ এবং রোপা আমন ধানের চারা রোপণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানের ফুল ফোটার সময়ে তাপমাত্রা যদি ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়, তবে ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপদাহের কারণে ধান চিটা হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিকের চেয়ে প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ধানের ফলন ক্ষেত্রবিশেষে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
কম বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের নদী-নালার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে আরও নিচে নেমে গেছে। এর ফলে আগামী বোরো মৌসুমে কৃষকদের গভীর ও অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত সেচ খরচের কারণে চাষিদের উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের পানির টেকসই ব্যবহারে বড় সংকট তৈরি হবে।
তীব্র তাপদাহের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল শস্য ক্ষেতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের উদীয়মান প্রাণিসম্পদ খাতও এখন অস্তিত্বের সংকটে। অতিরিক্ত গরমের কারণে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খামারে ‘হিট স্ট্রোক’-এ মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ডেইরি খামারে গাভীর দুধ উৎপাদন এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুর ও মৎস্য ঘেরের পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। এতে মাছের রোগবালাই বাড়ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের আমিষের চাহিদ পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নদ-নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সুযোগে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে সমুদ্রের লোনা পানি ভেতরের দিকে চলে আসছে। এই তীব্র লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার একর ফসলি জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এর ওপর গরম ও আর্দ্র আবহাওয়াকে কেন্দ্র করে ধানের বাদামি গাছ ফড়িং (কারেন্ট পোকা) এবং ভুট্টার ক্ষতিকর ‘ফল আর্মিওয়ার্ম’-এর আক্রমণ ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।
অর্থনীতিবিদ ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এল নিনোর কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের খাদ্য বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
চাল, ভুট্টা এবং শাকসবজির সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।
পোল্ট্রি ও গবাদিপশুর খাদ্যের মূল উপাদান ভুট্টার উৎপাদন কমে গেলে ফিডের দাম বেড়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে বাজারে ডিম ও মাংসের দাম আরও চড়া হতে পারে, যা মধ্য ও নিম্নবিত্তের পুষ্টি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কৃষকদের খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাতের (যেমন- ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৭১ ইত্যাদি) ফসল চাষে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে সেচের পানির অপচয় রোধে ‘এডিসি’ (Alternate Wetting and Drying – AWD) বা পর্যায়ক্রমিক ভিজানো ও শুকানো পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখন থেকেই চাল ও খাদ্যশস্যের বাফার স্টক (জরুরি মজুত) গড়ে তোলার পাশাপাশি আপদকালীন আমদানির বিকল্প পথ প্রস্তুত রাখতে হবে।





