
মাটির যে প্রাণ, মাটি যে প্রাণের সঞ্চার করে, খাবার দেয়; অর্থাৎ মাটি যে মা একথা অস্বীকার করার কি উপায় আছে? কিন্তু অনাদরে, অপব্যবহারে সম্পর্ক যেমন নষ্ট হয়, এই প্রাণমাটিও নষ্ট হয়। ধ্বংস হয়। অনুর্বরা হয়। আর খাবার দিতে পারে না, অসুস্থ মায়ের মতো। মাটি শুধু ধূলিকণার সমষ্টি নয়; এর গভীরে স্পন্দিত হয় কোটি কোটি অণুজীবের এক মহাজগত। মাটি এক জীবন্ত সত্তা। কিন্তু আধুনিক চাষাবাদের নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার,কীটনাশক আর আগাছানাশকের নামে বিষের তীব্র দাপটে আজ মাটির সেই সহজাত ‘প্রাণ’ ও উর্বরতা হারিয়ে যেতে বসেছে।
অবশ্য চাইলেই আমরা সেই প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারি। কীভাবে?

মাটিকে কৃত্রিম উপাদান দিয়ে শাসন করে নয়, তাকে প্রাকৃতিকভাবে জীবন্ত করে তোলার মাঝেই লুকিয়ে আছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের চাবিকাঠি। মাটির সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণকে ফিরিয়ে আনতে এবং তার সুস্বাস্থ্য ধরে রাখতে প্রকৃতি-নির্ভর কিছু বৈজ্ঞানিক ও চিরায়ত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরিসবুজ বিপ্লবের প্রথম ধাপটিই হলো মাটির জাদুকরী প্রস্তুতি আর জৈব সারের সুষম মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। মাটির সুরক্ষায় কৃষিবিদরা নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে বাস্তবিকই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে অনুর্বর মাটিকে আবার উর্বরতায় ফিরিয়ে আনা যায়।

প্রাকৃতিক কৃষিতে মাটির গুণমান ধরে রাখতে প্রতি শতাংশ জমিতে অন্তত ৫০ কেজি জৈব সার দেওয়া প্রয়োজন। তবে এই সার সরাসরি জমিতে না ফেলে, ছায়াদায়ী এক কোণে এনে ১৫ দিন আগে তার সাথে ২৫ শতাংশ মাটি মিশিয়ে এক টুকরো ‘জঙ্গলের পরিবেশ’ তৈরি করতে হয়। এই ২৫ শতাংশ মাটির অর্ধেক আসে নিজের জমির ওপরের স্তর বা ‘টপ সয়েল’ থেকে, আর বাকি অর্ধেক সংগৃহীত হয় কোনো পরিত্যক্ত ভিটা, জঙ্গল বা বড় গাছের নিচ থেকে—যেখানে কখনো রাসায়নিকের বিষাক্ত ছোঁয়া লাগেনি। নিজের জমির মাটি মেশানোর পেছনে রয়েছে এক গভীর মনস্তত্ত্ব; এতে মাটিতে থাকা আদি ব্যাকটেরিয়াগুলো নতুনের সাথে আগে থেকেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে, ফলে কোনো জীবাণুগত যুদ্ধের অবকাশ থাকে না।
মাটিকে আরও পুষ্ট করতে তৈরি করা যায় তরল অনুপুষ্টি সার। ২০০ লিটারের একটি বড় পাত্রে পাঁচ ধরনের ডাল এবং সরিষা, তিল, তিসি বা বাদামের মতো পাঁচ ধরনের তেলবীজ (প্রতিটি এক কেজি করে মোট ১০ কেজি) একসাথে গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সাথে যোগ হয় এক কেজি আখের গুড়, আয়রনের জোগান দিতে এক-দুই কেজি পুরনো লোহা এবং কপারের উৎস হিসেবে এক পোয়া তামা বা তামার তার। গরমের দিনে মাত্র তিন-চার দিনেই এই মিশ্রণে গাঁজন বা ফারমেন্টেশন শুরু হয়। বুদবুদ কেটে ওপরে ভেসে ওঠে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গির দুধের সরের মতো এক পুষ্টিকর আস্তরণ। এই চমৎকার তরলটি ওপর থেকে ছেঁকে জৈব সারের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, আর নিচের তলানিতে পুনরায় পানি ঢেলে এই জাদুকরী প্রক্রিয়া চালানো যায় তিন থেকে পাঁচবার।
মাটির অণুজীবের কলোনিকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হয় অনুপ্রাণ তরল সার বা ব্যাকটেরিয়া কালচার—যা সুভাষ পালেকারের ‘জীবামৃত’ বা লোকায়ত ‘কাঞ্জিপানি’র এক আধুনিক রূপ। ১০০ লিটার পানিতে এক কেজি সরিষার খৈল, আধা কেজি গুড়, আধা কেজি চাল বা গমের গুঁড়ো, প্রাকৃতিক ইস্টে ভরপুর এক বালতি চাল ধোয়া পানি, দশ কেজি কাঁচা গরুর গোবর, সামান্য জঙ্গলের মাটি এবং সালফারের জীবাণু বাড়াতে এক-দুটি কাঁচা ডিম মিশিয়ে এই তীব্র সার তৈরি হয়। তবে এই সার এতটাই কড়া যে, সরাসরি গাছের গোড়ায় বা পাতায় দিলে গাছ পুড়ে মারা যেতে পারে।
তবে সার দেওয়ার আগে মাটির অম্লত্ব বা পিএইচ (pH) জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। আদর্শ মাটির পিএইচ মান হওয়া উচিত ৭-এর কাছাকাছি। মাটি যদি অতিরিক্ত অম্লীয় বা এসিডিক হয়ে পড়ে, তবে প্রতি শতাংশে এক কেজি করে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হয়, যা মাটিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি একযোগে মেটায়। তবে এখানে একটি কঠোর সতর্কতা মেনে চলতে হয়—চুন দেওয়ার অন্তত ১৫ দিনের মধ্যে কোনো জৈব বা ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ সার মাটিতে দেওয়া যায় না; কারণ চুন তৎক্ষণাৎ উপকারী অণুজীবগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে।
অরণ্যে যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে ডালপালা ও পাতা পড়ে থাকে, ঠিক সেই পরিবেশ তৈরি করতে মাটির নিচে ও ওপরে মরা কাঠ ও ডালপালার বায়োমাস দেওয়া হয়। সার মেশানোর পর পুরো জমি খড়, লতাপাতা বা আখের ছিবড়ে দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, যা ‘মালচিং’ বা জাবড়া পদ্ধতি। এতে মাটির আর্দ্রতা যেমন বজায় থাকে, তেমনি ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের দল রোদের তীব্র উত্তাপ থেকে রক্ষা পায়। এই হালকা ভেজা বা ‘জো’ অবস্থায় জমিকে এক মাস পরম নিশ্চিন্তে রেখে দিলে দেখা যাবে, বুক চিরে প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে উঠছে অজস্র মাশরুম। এই মাশরুমের আগমনই জানান দেয়—মাটি তার হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছে, সে এখন নতুন চারাকে বুকে টেনে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
মাটির এই প্রাণ সুরক্ষার কোনো সাময়িক আয়োজন নয়। রীতিমতো লড়াই। এবং দীর্ঘমেয়াদি। মাটির পরম বন্ধু কেঁচো ও উপকারী অণুজীবদের নির্বিচারে হত্যা করা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ রাসায়নিক সারের প্রয়োগ বন্ধ করা প্রয়োজন। রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে না ফেলে সেগুলোকে কম্পোস্টে রূপান্তর করে মাটিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সাথে, একই জমিতে বারবার এক জাতীয় ফসল না বুনে ডাল ও তেলবীজের মতো ফসলের পর্যায়ক্রমিক চাষ বা ‘ফসল আবর্তন’ করতে হবে, যা মাটির নাইট্রোজেন ও পুষ্টির ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই বজায় রাখে।
সর্বোপরি প্রকৃতির প্রতি এই দায়বদ্ধতা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিই দায়বদ্ধতা।
শাঁওলী সুমন




