Spread the love

চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসে বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে সামগ্রিক খাদ্য মূল্যসূচক কিছুটা স্থিতিশীল দেখালেও চাল, গম ও চিনির মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। একই সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ, লজিস্টিকস সংকট এবং ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার বৈরী প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে ১৩টি বড় অঞ্চল বা দেশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্বব্যাংকের চলতি জুনের যৌথ মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে এসব উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।

 

চাল ও গমের বাজারে অস্থিরতা, চিনির দাম শীর্ষে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা হওয়া প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর মূল্য পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে ভোজ্যতেল ভূমিকা রাখলেও শস্যের বাজার বেশ উত্তপ্ত। মে মাসের শেষ ও জুনের শুরুতে বিশ্ব খাদ্য মূল্যসূচক (FFPI) গড়ে ১৩০.৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

গত এক মাসে বিশ্ববাজারে চালের মূল্যসূচক ২.৭% এবং গমের মূল্যসূচক ২.৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোতে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কম হওয়া এবং এশিয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বড় প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। অন্যদিকে, প্রধান উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলে আখের রস থেকে চিনি উৎপাদনের চেয়ে ইথানল (জ্বালানি) তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় সরবরাহ কমেছে। ফলে বিশ্ববাজারে চিনির দাম প্রায় ৭.৫% বৃদ্ধি পেয়ে গত ৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 যে কারণে বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকি

বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি জুন মাসে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার সামনে ৩টি প্রধান চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: ১. জ্বালানি ও সারের চড়া দাম: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহন সংকটের কারণে সার ও ক্রুড অয়েলের (জ্বালানি তেল) দাম চড়া রয়েছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ২. এল নিনোর আঘাত: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয় শক্তিশালী ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ব্রাজিলে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে, যা আসন্ন মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। ৩. রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা: অভ্যন্তরীণ বাজার ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের চাল ও শস্য রপ্তানিতে নতুন করে কোটা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রবণতা বাড়ছে।

চরম ঝুঁকিতে বিশ্বের ১৩ ‘হাঙ্গার হটস্পট’

জাতিসংঘের জুন ২০২৬-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৩টি অঞ্চল বা দেশকে তীব্র খাদ্য সংকটের চরম ঝুঁকিতে থাকা ‘হাঙ্গার হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ ও জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে সুদান, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

শুধুমাত্র সুদানেই প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যহীনতায় ভুগছেন, যার মধ্যে জুনের পর ২ লাখ মানুষ চরম দুর্ভিক্ষের (IPC Phase 5) মুখোমুখি। গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলেও ১.৬ মিলিয়নের বেশি মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সতর্কতা

আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, চড়া ডলার মূল্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর খাদ্য আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি এল নিনোর প্রভাবে আগামী দিনগুলোতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত ব্যাহত হয়, তবে চাল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমতে পারে, যা স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি স্পষ্ট করছে যে, পৃথিবীতে খাদ্যের উৎপাদন বা প্রাপ্যতা যতটা না বড় সমস্যা, তার চেয়ে বড় সংকট তৈরি করছে যুদ্ধ, লজিস্টিকস জট এবং চরম আবহাওয়া। সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের দ্রুত খাদ্য সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।