
মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। পাতে প্রোটিনের জোগান নিয়ে আমাদের আর ভাবতে হয় না। কিন্তু এর উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে একটি ধূসর বাস্তবতা—আমাদের দুগ্ধ শিল্প। তরল দুধ থেকে শুরু করে গুঁড়ো দুধ, প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। অথচ মাঠপর্যায়ের খামারিদের গো-খাদ্যের চড়া দামের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে যদি সঠিক লজিস্টিক ও কোল্ড চেইন সাপোর্ট দেওয়া যেত, তবে এই বাংলাদেশেই গুঁড়ো দুধের এক ‘শ্বেত বিপ্লব’ ঘটানো সম্ভব হতো।

সকালের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা দুধ চা থেকে শুরু করে উৎসবের সেমাই-পায়েস, কিংবা শহুরে বেকারি ও মিষ্টির দোকান—বাঙালির দৈনন্দিন জীবন ও খাদ্যসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে গুঁড়ো দুধ। তরল দুধের তুলনায় দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় বলে গৃহস্থালি ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক খাতেও এর গ্রহণযোগ্যতা এখন আকাশচুম্বী।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বছরে দুধের মোট চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ১ কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন দুধের ঘাটতি রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই ঘাটতি সীমিত মনে হলেও, প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে এর বড় একটি অংশ গুঁড়া দুধ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।

দুধের চাহিদা পূরণে আমদানি নির্ভরতা
বর্তমানে দেশে গুঁড়ো দুধের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টন। এর বিপরীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি মিল্ক প্রসেসিং বা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান মিলে বছরে উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টন। অর্থাৎ, চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই মেটাতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে! কেবল এক বছরেই এই খাতে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যা আমদানিকারকদের করসহ খুচরা বাজারে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
দুগ্ধ শিল্পে আমাদের এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ লুকিয়ে আছে মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতায়। আমাদের দেশে তরল দুধের বার্ষিক চাহিদার তুলনায় উৎপাদন এখনো কিছুটা কম। আর এই কম উৎপাদনের পেছনে প্রধান বাধা—পশুখাদ্যের আকাশছোঁয়া দাম।

একজন খামারিকে গাভী পালনে সবচেয়ে বড় খরচটি করতে হয় ভুসি, খৈল ও প্রক্রিয়াজাত গো-খাদ্য কিনতে গিয়ে। বাজারে পশুখাদ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সেই তুলনায় দুধের পাইকারি মূল্য milছে না। প্রান্তিক খামারিরা অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হন।একদিকে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে বিক্রয়মূল্যের অনিশ্চয়তা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে অনেক খামারিই এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কাঁচামাল বা তরল দুধের এই সংকটই মূলত দেশীয় কোম্পানিগুলোকে গুঁড়ো দুধের বড় বাজার ধরার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখছে।
খামারের অর্থনীতি: একটি গাভীর দৈনিক আয়–ব্যয়ের হিসাব

মাঠপর্যায়ে একটি উন্নত জাতের দুগ্ধজাত গাভী থেকে কেমন লাভ বা লোকসান হচ্ছে, তার একটি আনুমানিক দৈনিক আর্থিক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
দৈনিক খরচ (ফিড, খড়, ভুসি ও চিকিৎসা): ৪০০.০০ টাকা
দৈনিক আয় (গড়ে ১৫ লিটার দুধ × ৭০ টাকা): ১,০৫০.০০ টাকা
দৈনিক নিট মুনাফা: ৬৫০.০০ টাকা
আপাতদৃষ্টিতে একটি গাভী থেকে দৈনিক ৬৫০ টাকা বা মাসে প্রায় ১৯,৫০০ টাকা নিট মুনাফা হওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গো-খাদ্যের বাজার অস্থির হলে এই ৪০০ টাকার খরচ সহজেই ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোল্ড চেইনের অভাবে খামারিরা অনেক সময় লিটারপ্রতি ৭০ টাকা মূল্য পান না। এছাড়া গাভীর ড্রায়-পিরিয়ড এবং প্রজননকালীন লুকানো খরচগুলো সমন্বয় করতে গিয়ে প্রান্তিক খামারিরা প্রায়শই হিমশিম খান।
সংকট উত্তরণের চাবিকাঠি: কোল্ড চেইন ও লজিস্টিক সার্পোট
দেশীয় গুঁড়ো দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর রেয়াতসহ বিশেষ সরকারি লজিস্টিক সুবিধা দিতে হবে। দুধ একটি অত্যন্ত পচনশীল পণ্য। প্রত্যಂತ অঞ্চলের খামার থেকে উৎপাদিত তরল দুধ যদি দ্রুত এবং গুণগত মান ঠিক রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে না পৌঁছানো যায়, তবে গুঁড়ো দুধের কারখানাগুলো কখনোই সচল রাখা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এজন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী কোল্ড চেইন নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক লজিস্টিক সাপোর্ট।
দেশের দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে (যেমন সিরাজগঞ্জ, পাবনা বা চিলমারী) পর্যাপ্ত ‘চিলিং সেন্টার’ বা দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। এতে খামারিদের দুধ নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে না এবং তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন। আধুনিক বিশেষায়িত পরিবহনের (Refrigerated Van) মাধ্যমে দ্রুত তরল দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে নিয়ে এসে তা গুঁড়ো দুধে রূপান্তর করার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
নারী উদ্যোক্তা ও সরকারি প্রণোদনা: নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত

বর্তমানে দেশের দুগ্ধ খাতে আরেকটি বড় আশার আলো দেখাচ্ছে নারী খামারিদের নীরব অংশগ্রহণ। নারীদের যদি সহজ শর্তে ঋণ, বিশেষ প্রণোদনা এবং উন্নত ভেটেরিনারি ও খামার ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল রূপান্তর ঘটবে। সরকার দুগ্ধ খাতের পরিধি বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমাতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে এই লক্ষ্যকে শুধু কাগজে-কলমে না রেখে মাঠপর্যায়ে সফল করতে হলে—
পশুখাদ্যের সিন্ডিকেট ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
মাংসের মতো দুগ্ধ শিল্পেও স্বনির্ভরতা অর্জন বাংলাদেশের জন্য কোনো অসম্ভব স্বপ্ন নয়। হাজার হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ আমদানির এই পরনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন কেবল সঠিক নীতিগত সহায়তা, পশুখাদ্যের মূল্যের লাগাম টেনে ধরা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি টেকসই কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা। প্রান্তিক খামারি, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে যেদিন দেশীয় গুঁড়ো দুধের উৎপাদন চাহিদার সমীকরণ মেলাতে পারবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে ভাঙবে আমদানির শেকল; সফল হবে দুগ্ধ শিল্পের ‘শ্বেত বিপ্লব’।
শাঁওলী সুমন





