Spread the love

দেশে খাদ্যের অভাব নেই কিন্তু যেটা আছে তা হলো খাদ্য গ্রহণে সক্ষমতার অভাব। নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়, তারা এখন খাবারের পেছনে ব্যয় আরও কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কথাটা এজন্য বললাম কারন এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর সমৃদ্ধি’। আর সরকারি আমলারা কোনো নতুন উদ্ভাবনের চিন্তা না করেই পুরোনো কায়দায় দিবস পালন করেছেন । আর তাদের প্রেসক্রিপশনে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকগন দাবী করেছেন, ‘দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে’। খুব চেনা বাক্য আমাদের। যদিও সব্জি, ডিম, মাছ ( না মাছও আমদানি হয়,আর এবারতো ইলিশও এসেছে ভারত থেকে)  ছাড়া অন্যান্য খাদ্য আমদানি অব্যাহত আছে। কারণ, বাংলাদেশ ছোট্ট একটা দেশ এবং এই দেশে সকল খাদ্য সম্পূর্ণভাবে উৎপাদিত হয় না। ঘাটতি পূরণে সরকারকে আমদানি করতেই হয়। সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু কোথা থেকে, কত দাম দিয়ে কেনা হচ্ছে সেই প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত।

ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাত্র ৩দিন আগে আমেরিকার সাথে একটি বিতর্কিত চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক চাপের মুখে পড়বে। কারণ মোট ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন শুল্ক ছাড়ের শর্ত দেওয়া এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে আগামী ৫ বছর আমেরিকা থেকে গম, সয়াবিন, তুলা, দুগ্ধজাত পণ্য, মাংসসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক। অন্য দেশে দাম যাই হোক মার্কিনীদের বেঁধে দেয়া দাম অনুযায়ীই আমাদের কিনতে হবে। এ ছাড়া শর্তে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা দেশীয় শিল্প-কৃষিতে কোনো ধরনের অ-বাণিজ্যিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। আর বিমান কেনার চুক্তি তো রয়েছেই।

এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম দামে ও ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কৃষক ও খামারিরা টিকতে না পারার আশঙ্কা রয়েছে। এমনিতেই কৃষি অলাভজনক, কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি কমছে। এই ধরণের অসম চুক্তি অব্যাহত থাকলে আগামীতে কৃষি করার মানুষ পাওয়াটা কষ্টকর হবে। কৃষক না থাকলে খাদ্য আসবে কোথা থেকে? বিদেশ থেকে কেনা খাবার আমাদের সাধারণ মানুষ কিনতে পারবে তো!
খাদ্য রাজনীতি একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব ধ্বংসে একটি গভীর ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন থেকে চলছে। সরকার নিজেও এই ফাঁদে পা দিয়ে রেখেছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্যখাতের মাফিয়াদের সুবিধাভোগী হয়ে ক্ষতি করছে দেশের কৃষি ও কৃষকের। আমাদেরকে এমন সব খাবারের দিকে প্রলুব্ধ করছে যা প্রকারান্তরে মানুষের মধ্যে নানাবিধ অসুখ তৈরি করছে। সেই অসুখ সারানোর জন্য আমরা আবার তাদেরই নিয়ন্ত্রিত ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ কোম্পানীর উপর নির্ভর করছি। ভয়ঙ্কর এক দুষ্টচক্র যেন আমাদের ভবিষ্যতকে জাপটে ধরেছে!

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিতে হবে। ইউনিয়নভিত্তিক পরিকল্পনা জোরদার করতে হবে। খাদ্য সার্বভৌমত্বের দর্শন ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে হবে। কৃষিখাতে যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন এবং তার জন্য প্রয়োজন কৃষি সমবায় গঠন ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। কৃষি মন্ত্রণালয়কে কৃষি/কৃষক সমবায় বা সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন দিতে হবে এবং তাদের আর্থিক সহায়তাসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অধিকতর কার্যকর পরিকল্পনা ‍ও উদ্যোগ নিতে হবে।
স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। তরুণদেরকে সম্পৃক্ত করে, তাদের কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ করে কৃষিতে রূপান্তর আনা সম্ভব। আগামীর সমৃদ্ধি তারুণ্যের শক্তিতে।
খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সাথে খাদ্য নিরাপদতার উদ্বেগও সীমাহীন। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। কৃষিতে নিয়োজিত সেবাদানকারী তথা কীটনাশক ডিলার, খুচরা বিক্রেতা, বীজ বিক্রেতাদের অনেকেই স্বল্প শিক্ষিত বা অপ্রশিক্ষিত। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া ডিলার বা বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ না দেয়ারে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের কৃষি কমিটিকে কার্যকর করার কোন বিকল্প নেই।
কৃষি সমৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদতার জন্য সরকারকে দেশীয় স্বার্থে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। দেশের মাটি বাঁচাতে হবে। বন্ধ্যা মাটিগুলোতে জৈব উপাদান বৃদ্ধি করে মাটিকে প্রাণায়িত করা হলে বাংলাদেশে ক্ষেতের মাঠ ভরে উঠবে নিরাপদ শস্য-কুসুমে ফলে। জৈব সারের সম্প্রসারণে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও প্রণোদনা বাড়ালে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি হবে স্বয়ম্ভর।

আতাউর রহমান মিটন