
সময়টি ছিল ১৭৬০ সাল। তখন নাটোরের শাসক ছিলেন মহারানী ভবানী। লালবাজারে মধুসূদন পালের একটি মিষ্টির দোকান । একদিন তার দোকানের কারিগর কাজে আসেননি। এতে বড় বিপত্তি ঘটে। দোকানে প্রচুর খাঁটি ছানা জমা ছিল। কারিগর না থাকায় ছানাগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।

মধুসূদন পাল ছানা রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাঁচা ছানার মধ্যে চিনির রস ঢেলে দেন। এরপর হালকা আঁচে তা গরম করেন। এভাবেই দুর্ঘটনাবশত তৈরি হয় এক নতুন মিষ্টি। এর নাম দেওয়া হয় কাঁচাগোল্লা।কাঁচাগোল্লার খবর রাজবাড়ীতে পৌঁছায়। মহারানী ভবানী এই মিষ্টির দারুণ প্রশংসা করেন। তিনি নিজেই এর নাম প্রচার করেন। ধীরে ধীরে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার নবাবদের কাছে এই মিষ্টি পাঠানো হতো। এমনকি বিলেতের রাজপরিবারেও নাটোরের কাঁচাগোল্লা পৌঁছাত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যেও কাঁচাগোল্লার কথা রয়েছে। তিনি পাত্রপক্ষের আপ্যায়নের বর্ণনায় নারকেলের সন্দেশ ও কাঁচাগোল্লার কথা উল্লেখ করেছেন। এভাবে নাটোরের এই মিষ্টি ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নেয়।
দীর্ঘ পথচলার পর কাঁচাগোল্লা বড় একটি স্বীকৃতি পায়। এটি বাংলাদেশের ১৭তম ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে মর্যাদা পায়। তবে এই স্বীকৃতিই শেষ কথা নয়। সাধারণ ভোক্তাদের মনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আমরা কি এখনো সেই আগের কাঁচাগোল্লার আসল স্বাদ পাচ্ছি?

বর্তমানে নাটোরের একেক দোকানে একেক স্বাদের কাঁচাগোল্লা পাওয়া যায়। কোনো দোকানে মিষ্টি অনেক বেশি। কোনো দোকানে মিষ্টি আবার কম। কিছু দোকানে ছানা বেশি জ্বাল দেওয়া হয়। ফলে মিষ্টি তার নরম ভাব হারিয়ে ফেলে। কোনো মিষ্টি একদিনেই নষ্ট হয়। আবার কোনো মিষ্টি দুই-তিন দিন টিকে থাকে।
কাঁচাগোল্লা তৈরি করা সহজ কাজ নয়। ভালো কাঁচাগোল্লা বানাতে খাঁটি দুধ প্রয়োজন হয়। দুধ থেকে প্রথমে ছানা তৈরি করা হয়। ছানা ঠান্ডা করে নানা ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সব মিলিয়ে এক ব্যাচ মিষ্টি তৈরি করতে প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
গরম, বৃষ্টি বা ঝড় উপেক্ষা করে খামারিদের থেকে দুধ সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু কাঁচাগোল্লার সুনির্দিষ্ট রেসিপি না থাকায় এই পরিশ্রম অনেক সময় সঠিক ফল দেয় না। নির্দিষ্ট রান্নার তাপমাত্রা ও সময়ের অভাব থাকায় স্বাদের তারতম্য ঘটে।
জেলা প্রশাসন কাঁচাগোল্লার মান বজায় রাখতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা মিষ্টি ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভার আয়োজন করেছে। সচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাইরে থেকে পর্যটকরা নাটোরে এলে কাঁচাগোল্লা কিনে নিয়ে যান। তাই নাটোরের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই মিষ্টির মান অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন।
কাঁচাগোল্লার আসল ঐতিহ্য বাঁচাতে হলে সুনির্দিষ্ট রেসিপি তৈরি করতে হবে। ছানা, চিনি ও মসলার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা দরকার। কত তাপে কতক্ষণ রান্না হবে তা স্থির করা জরুরি। তবেই নাটোরের কাঁচাগোল্লা তার শত বছরের আদি ও খাঁটি স্বাদ ফিরিয়ে পাবে।




