
” যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বলিতেছি। সবকিছু নিয়ে মিথ্যে বলা গেলেও খাবার জিনিস নিয়া মিথ্যা বলা যায় না। “ তাহলে হলফ করে সত্য বলছেন মন্ত্রী। আর গণমাধ্যম কি মিথ্যে বলছে? সরকার ইউরিয়ার কথা বলে ডিএপি ও পটাশের চাহিদা মজুত কত তা বলেন না । কেন সারের গুদাম লুট হলো ? কেউ কি গ্রেপ্তার হয়েছে? সরকার কি মামলা করেছে ? কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার কোনো পরিস্যংখ্যান কোথায়?

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ সুপরিচিত হলফনামার ঢঙে সুর তুলে বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় সংসদে ।মন্ত্রীর সেই সাবলীল ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিসংখ্যান, মজুদ আর পাইপলাইনের চালানের আশ্বাসবাণী। আর এদিকে, সারের সংকট, ডিলারের দ্বারে দ্বারে কৃষকের দীর্ঘ লাইন আর ক্ষোভের চিত্র।

সংসদে মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি দাবি করেন, দেশে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে, আর বঙ্গোপসাগরে কিংবা বন্দরে বহিনঙ্গরে অন-দ্য-ওয়ে রয়েছে আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার টনের বেশি সার। দেশের বার্ষিক প্রায় ৪০ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে এই পরিসংখ্যান খাতায়-কলমে বেশ স্বস্তিদায়ক মনে হতেই পারে। মন্ত্রী পরিসংখ্যানের ডালি খুলে রংপুর জেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের বরাদ্দের সঙ্গে চলতি বছরের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন, কেবল ইউরিয়া নয়—টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি (পটাশ) সারের সরবরাহও গত বছরের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে বেশি।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি সরকারের খাতায় কোটি কোটি টাকার সারের মজুত থাকে, তবে উত্তরবঙ্গের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে মাঠে মাঠে সারের সংকট নিয়ে কেন হাহাকার? গণমাধ্যমে কেন দেখা যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কৃষকের খালি হাতে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য?
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও উদ্বেগের ঘটনা ঘটেছিল কুড়িগ্রামে, যেখানে পর্যাপ্ত ও সময়মতো সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা শেষ পর্যন্ত ডিলারের গুদামে চড়াও হয়ে সার নিয়ে যেতে বাধ্য হন।
ডেপুটি স্পিকার নিজে এবং আরো দুজন সাংসদ সারের সংকটের কথা বলেছেন । সারের কোনো সংকট না থাকলে তিন মন্ত্রীর মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হলো কেন? সেই কমিটির কোনো সভা বা তাদের কোনো বিবৃতি নাই কেন ? কৃষি সচিব রংপুরে গিয়ে হুমকি ধামকি দেযার পর কুড়িগ্রামে সার লুট হয়েছে,পুলিশই বলছে ২৬৫ বস্তা নিয়ে গেছে কৃষকরা । রাজশাহীকে পটাশ ও ডিএপি না পাওয়ার বিক্ষোভ এবং ফাটিলাইজার এসোসিয়েশন সংকট নিয়ে সাংবাদ সম্মেলন করেছে। কৃষিজীবী কৃষিমন্ত্রীর হলফনামামুলক বক্তব্যে এসবের কোনো উল্লেখ নাই কেন?
কৃষকের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া কি সারের প্রাচুর্যের লক্ষণ?
বাংলাদেশে সারের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই ডিলার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বিদ্যমান। বিসিআইসি ও ডিএই (DAE) ডিলাররা নির্ধারিত সরকারি দামে সার উত্তোলন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। যখন মাঠে ফসল বোনার বা সার দেওয়ার ঠিক উপযুক্ত সময় আসে, তখনই সার ‘গায়েব’ হয়ে যায়। কৃষকদের বোঝানো হয় বাজারে সারের চরম ঘাটতি। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে কৃষককে বাড়তি দামে খুচরা কালোবাজারিদের কাছ থেকে সেই সারই কিনতে হয়।
সাধারণ আলোচনার সময় কেবল ইউরিয়া সারের পরিসংখ্যান সামনে এনে সামগ্রিক সংকট ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা হয়। অথচ বর্তমানে কৃষিতে ডিএপি ও পটাশ (এমওপি) সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সারগুলো অধিকাংশ আমদানি-নির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, এলসি খোলা কিংবা শিপিং জটিলতার কারণে প্রায়শই সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। কিন্তু সংসদে যখন ‘সব ঠিক আছে’ বলে সাধারণিকরণ করা হয়, তখন তা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে।
মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, দেশের বার্ষিক চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ সার আমরা দেশে উৎপাদন করতে পারি। আমাদের সাতটি সার কারখানার মধ্যে বেশিরভাগই গ্যাসের সংকটে প্রায়শই বন্ধ থাকে। যেখানে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ থাকলে আমরা আরও ২৫ লাখ টন অতিরিক্ত সার উৎপাদন করতে পারতাম, সেখানে বিদেশনির্ভরতা আমাদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সারের গুদাম থেকে সার লুট হলো, কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের পকেট কাটা হলো কিন্তু এর পর কার্যকর কোনো পদক্ষেপের খবর সাধারণ মানুষ পায় না। কতজন অসাধু ডিলারের লাইসেন্স বাতিল হলো? কতজনের বিরুদ্ধে কালোবাজারির মামলা হলো? গুদাম হামলার ঘটনায় কারা দায়ী ছিল আর তাদের বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যান বা খতিয়ান সরকারি তরফ থেকে দেওয়া হয় না। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যায় আর কৃষক হয় নিঃস্ব।
শাওঁলি সুমন




