Spread the love

 

আবু তাহের খান

 

প্রায় প্রতি বৈশাখেই বৃষ্টির পানিতে, পাহাড়ি ঢলে ও ভাটি থেকে আসা জোয়ারে হাওরের ধান যখন ডুবতে শুরু করে গণমাধ্যম থেকে পাওয়া খবরের সুবাদে সরকারের তখন হঠাৎই মনে হয় যে, কৃষক কষ্টে আছে। আর হঠাৎ জেগে ওঠা সে সহানুভূতি দেখে নাগরিক বৈঠকখানা, গণমাধ্যমের পৃষ্ঠা ও পর্দা এবং হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও প্রশংসা ও স্তুতিতে পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঐ কৃত্রিম সহানুভূতির মধ্যে-যে নীতি-নির্ধারকদের সীমাহীন অজ্ঞতা ও উপেক্ষা লুকিয়ে আছে, তা কৃষক নিজে ছাড়া অন্য খুব সংখ্যকেরাই বুঝতে পারেন। অজ্ঞতা এটি যে, তারা বা তাদের অনেকেই মনে করেন, উল্লিখিত ঐ তিন উৎস থেকে আসা পানির নিচে ফসল ডুবে যাওয়াটাই কৃষকের মূল সমস্যা। কিন্তু তারা জানেন না যে, পানির নিচে আধাপাকা ধান ডুবে যাওয়াটাই কৃষকের মূল সমস্যা নয়– এটি তার অনেক সমস্যার একটি মাত্র। মূল সমস্যা হচ্ছে, পুঁজি বা উপকরণের অভাবে সে সময়মতো বীজতলা তৈরি করতে পারে না, ক্ষেতে চারা লাগাতে পারে না এবং সার, কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থাটিও সে সময়মতো করতে পারে না। এবং এ কাজগুলো যথাযথভাবে ও যথাসময়ে করতে না পারা থেকে সৃষ্ট বিলম্ব ও মানহীন চাষাবাদজনিত সমস্যাই বস্তুত তার সংকটের মূল জায়গা।

 

প্রয়োজনীয় উপকরণাদি ক্রয়ের জন্য কৃষকের হাতে যদি পর্যাপ্ত অর্থ থাকতো এবং সেসব উপকরণ যদি সে যথাসময়ে যথাযথ মান ও মূল্যে নিকটবর্তী যৌক্তিক দূরত্বসীমার মধ্য থেকে কোনো প্রকার ঝয়ঝামেলা ছাড়াই ক্রয় করতে পারতো, তাহলে ধারণা করা যায় যে, বীজতলা তৈরি ও নির্ধারিত জমিতে চারা লাগনোর কাজটি এমনিতেই আরো অন্তত ১০-১৫ দিন এগিয়ে আসতো। কিন্তু উপকরণ কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিজের হাতে না থাকায় মাঠে নামার আগে উক্ত অর্থ সংগ্রহের জন্য বেশকিছু দিন তাকে মহাজন, আড়তদার, এনজিও ও অন্য নানা জায়গায় ধর্ণা দিয়ে বেড়াতে হয়। এবং এসব জায়গায় ঘুরাঘুরি করতে যেয়ে তার আবাদ শুরুর কাজটি অনেকখানিই পিছিয়ে পড়ে। আর এ ঘুরাঘুরির মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও থেকে অর্থ যোগাড় হয় বটে, কিন্তু তা হয় বড়ই চড়া মূল্যে। আর সে অর্থের বিপরীতে একদিকে তাকে যেমন মোটা অঙ্কের সুদ বা সুদের বিপরীতে অপমূল্যে ফসল খোয়াতে হয়, তেমনি হারাতে হয় আবাদ শুরুর উত্তমতম সময়টিকেও। আর এ সময় হারিয়ে বিলম্বে আবাদ শুরুজনিত যে ক্ষতি, তার রেষ তাকে মওসুমের পরবর্তী প্রতিটি স্তরেই ধারাবাহিকভাবে বয়ে বেড়াতে হয়।

 

সে ক্ষেত্রে একেবারে প্রথমে তাকে যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হচ্ছে, বিলম্বে আবাদ শুরুর কারণে তার জন্য বীজতলা উপযোগী আদ্রতাপর্ণ উপযুক্ত জমির প্রাপ্যতা কমে যায়। দ্বিতীয়ত: বীজতলা থেকে চারা উঠিয়ে তা মূল জমিতে লাগানোর পর সেগুলো পুষ্ট হয়ে উঠবার আগেই উক্ত জমি শুকিয়ে যায়। ফলে পানি বা আদ্রতার ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন ধানের চারা পরিপূর্ণ পুষ্টতা লাভ করতে পারে না, অন্যদিকে তেমনি জমি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে দ্রুতই তাকে জমিতে সেচ দিতে হয় এবং এতে করে তার খরচ অনেকখানি বেড়ে যায়। তৃতীয়ত: প্রাকৃতিক সূত্রের পানি ও আদ্রতার উপর ভর করে লাগানো চারা যতোটা পুষ্ট হয় এবং তাতে যে পরিমাণে ধানের থোড় গজায়, সেচ-পানির পরিচর্যায় বিলম্বে লাগানো চারা সে পরিমাণে পুষ্ট হয় না এবং এর ফলে তাতে ধানের থোড়ও কম হয়। চতুর্থত: বিলম্বে চারা লাগানোর কারণে তাতে থোড়ও বিলম্বে গজায়। পঞ্চমত: এসব ধারাবাহিক বিলম্বের কারণে মাঠের ধান শেষ পর্যন্ত এমন এক সময়ে যেয়ে পাকে, যখন বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি ঢল ও নিচ থেকে ওঠে আসা জোয়ারের জল সবকিছু একসাথে হাওরকে চেপে ধরে। ফলে ধান পুরোপুরি পাকার আগেই অর্থাৎ আধাপাকা অবস্থাতেই কেটে ফেলতে হয়।

উপরোক্ত সমগ্র বিষয়টিকে একসাথে দেখলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, হাওরের আধাপাকা ধান অসময়ে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার জন্য ঢল, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি যতোটা না দায়ী, তারচেয়ে অনেক বেশি দায়ী কৃষকের আর্থিক অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মহাজন, আড়তদার, চালকল মালিক, এনজিও প্রভৃতি চালাক-চতুর শ্রেণীর দুরৃত্তপরায়ণ ব্যবসায়ীরা। এরা কৃষককে যেসব শর্তে টাকা ধার দেয়, তা শুধু অযৌক্তিকই নয়– একইসঙ্গে অমানবিক এবং শোষণমূলকও। এবারে শর্তগুলোকে খানিকটা বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করা যাক। উল্লিখিত ঋণদাতারা কৃষককে এ ঋণ দেন সাধারণত মাস তিনেকের জন্য– বীজতলা নির্মাণ থেকে শুরু করে ফসল উঠানে ওঠা পর্যন্ত সময়ের জন্য। কিন্তু তারা সুদ হিসাব করেন ১২ মাসের, যা একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা। দ্বিতীয়ত: এ ক্ষেত্রে তারা যে সুদের হার নির্ধারণ করেন, তা প্রচলিত বাজার হারের চেয়ে  অন্তত ২ থেকে ৩ গুণ বেশি, যা শুধু শোষণই নয়– শোষণেরও এক চরম পর্যায়। তৃতীয়ত: এ ঋণের সুদ-আসলসহ পাওনা অর্থ তারা নগদে নেন না– নেন ফসল আকারে। সে ক্ষেত্রে তারা ধানের যে মূল্য নির্ধারণ করেন, তা সাধারণত বাজারদরের চেয়ে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম, যা অবধারিতভাবেই কৃষককে ঠকানো। চতুর্থত: মহাজন, আড়তদার ও চালকল মালিকদের শর্ত থাকে যে, ঐ ধান তারা ঋণদাতা ভিন্ন অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারবে না। অথচ তা অন্যত্র বিক্রি করলে কৃষক অনেক বেশি মূল্য পেতেন। পঞ্চমত: ঋণদাতারা পাওনা আদায় করতে যেয়ে অর্থের বিপরীতে যখন ধান বুঝে নেন, তখন মাপের ক্ষেত্রে তারা কয়েক স্তরে কৃষককে প্রচণ্ডভাবে ঠকান। কখনো বলেন ধান ভেজা, তাই মণে ১০ বা ১৫ কেজি বেশি দিতে হবে। কখনো বলেন ধান পুষ্ট হয়নি, তাই মনে ১২ থেকে ১৫ কেজি বেশি না দিলে তারা তা নেবেনই না। আবার কখনো এমনও বলেন যে, গুণগত মান ভালো না হওয়ায় এ ধান তারা কিনবেনই না, যা আসলে কৃষকককে ঠকানোর এক ধরনের ফন্দি ছাড়া আর কিছুই নয়।

মোটকথা, চাষাবাদের জন্য ঋণ সংগ্রহ করতে যেয়ে কৃষক এখন দাদনদার মহাজন, আড়তদার, চালকল মালিক, ফড়িয়া, এনজিও প্রমুখের কাছে পরিপূর্ণভাবে জিম্মি। আর এ অবস্থা থেকে তার আংশিক মুক্তি পাওয়ার উপায় হতে পারতো প্রচলিত ব্যাংকখাত থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারাটা। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ছাড়া এ ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করার জন্য বলতে গেলে আর  কৃষকের নাম ভাঙ কেউই নেই। অথচ বাকি ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের শর্তে বলা আছে যে, প্রদেয় ঋণের একটি অংশ তারা কৃষিখাতেও বিতরণ করবে। তদুপরি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক তাদেরকে ঋণ বিতরণের বছরওয়ারী যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া হয়, সেখানেও কৃষিখাতের জন্য বরাদ্দ থাকছে। কিন্তু বাস্তবে এসব শর্ত ও লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সবই কাগুজে কথাবার্তা। তবে-যে বছর শেষের হিসাবে প্রায় প্রতিবছরই কৃষিঋণ বিতরণ তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলে কিংবা কাছাকাছি পৌঁছে যায়, সেটি তাহলে কী? সেটি হচ্ছে কৃষকের নাম ভাঙ্গিয়ে তারপপ সাথে আরো এক ধরনের প্রতারণা। কৃষি সহায়ক, কৃষিভিত্তিক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে শহুরে উদ্যোক্তাদেরকে ঋণ দিয়ে সেটিকেই বহুক্ষেত্রে দেখানো হচ্ছে কৃষিখাতের ঋণ বিতরণ হিসেবে।

এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত মহাজন, আড়তদার, এনজিও প্রমুখেরাই কৃষকের অসহায় গন্তব্য হয়ে থাকছে। এর মানে হচ্ছে, এ রাষ্ট্র ও সমাজের চতুর্দিকে কৃষককে ঠকানোর এত আয়োজন তৈরি হয়ে আছে যে, সেসব ডিঙ্গিয়ে হাওর-ডাঙ্গা নির্বিশেষে কোনো স্থানের কৃষকের পক্ষেই তার ধান কিংবা অন্য ফসলকে ঢল-বৃষ্টি-জোয়ারের পানি, খরা, দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ইত্যাদির আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আর ফসলই যদি রক্ষা না পায়, তাহলে কৃষকের ফসলনির্ভর জীবন বাঁচেই-বা কেমন করে? না, জীবনের পূর্ণাঙ্গ অর্থ বিবেচনায় কৃষক আসলে মোটেও বেঁচে নেই– অর্ধমৃতের মতো তার কায়াটিই শুধু টিকে আছে।তবে বৈষম্যম্যপীড়িত এ শোষণমূলক রাষ্ট্র তাকে পুরোপুরি মরতেও দেবে না। কারণ পরবর্তী নির্বাচনে জিতে আসার জন্য তার ভোটটি কারোর না কারো লাগবেই। তদুপরি লাগবে দেশের সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও।

 

মোটকথা, সকলের স্বার্থ হাসিলের জন্য কৃষককে লাগবেই এবং সবচেয়ে বেশি লাগবে দানদার মহাজন, ধান ব্যবসায়ী আড়তদার, চালকল মালিক, এনজিও, প্রমুখের সুদী ব্যবসা ও সওদাগরিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। তাহলে বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদ যে বললো, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে– কৃষক ও শ্রমিককে– এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা’, সেটির কী হবে?

 

আবু তাহের খান: আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক।