
সেই প্রাগ-ঐতিহাসিত যুগে দুর্ঘটনাবশত একটুকরো মাংস পড়ে গিয়েছিল জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডে। সেই মাংসের টুকরো মুখে দিয়ে মানুষ দেখল তা বেশ সুস্বাদু। দুর্ঘটনাবশতই হোক বা দাবানলের আগুনে পুড়ে যাওয়া পশুর মাংস দিয়েই কিন্তু শুরু হয়েছিল মানুষের সভ্যতার প্রথম বিকাশ। মানুষ দেখল কাঁচা মাংসের বদলে আগুনে ঝলসানো মাংস সহজে চিবানো যায় ও তা হজমও হয় দ্রুত। বিজ্ঞানও বলে, এই ঝলসানো মাংসই মানুষের মস্তিষ্কের গঠনে এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, খাবারের টেবিলের এই ঝলসানো মাংসের গন্ধ আপনাকে নিশ্চয়ই চাঙ্গা করে তোলে! কারণ এটা আপনি পরম্পরা ধরে বহন করে চলছেন। তবে সত্যি বলতে কি, এই ঝলসানো মাংস মূলত গরীবের খাবার ছিল। তখনো অভিজাতদের টেবিলে ওঠেনি। জানতে চান কিভাবে সেই ঝলসানো মাংস আজকের বারবিকিউতে রূপ নিল?

এর পেছনে বড় অবদান রয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ‘তাইনো’ উপজাতির। তারা দেখল সরাসরি আগুনে মাংস ঝুলিয়ে দিলে তা পুড়ে শক্ত হয়ে যেত। তাইনোরা কাঠের ওপর উঁচু কাঠামো বানিয়ে নিচে হালকা আঁচে ধোঁয়া দিয়ে ধীরে ধীরে মাংস সিদ্ধ করা শুরু করে। এই পদ্ধতিকে তারা বলত ‘বারবাকাও’ । ১৬ শতকে স্পেনীয় অভিযাত্রীরা এই পদ্ধতি দেখে চমকে যান। তারা ‘বারবাকাও’ শব্দ ও পদ্ধতিটি গ্রহণ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে দেন, যা কালক্রমে ‘বারবিকিউ’ নামে পরিচিতি পায়। ১৮ ও ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বারবিকিউ এক নতুন মাত্রা পায়। কম দামি বা শক্ত মাংসের টুকরোকে নরম করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম তাপে ও কাঠে পোড়া ধোঁয়ায় সেদ্ধ করার ঐতিহ্য তৈরি হয়। এর সাথে যুক্ত হয় ভিনেগার, টমেটো, সরিষা ও নানা রকম শুকনো মশলার জটিল রসায়ন, যা আজকের বিখ্যাত ‘টেক্সাস’ বা ‘ক্যারোলিনা’ স্টাইল বারবিকিউর জন্ম দেয়।

১৯ শতকের মধ্যে এই রান্নার কৌশলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলে বেশ শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসে। ওই অঞ্চলে শূকরের আধিক্য থাকায় শূকরের মাংসই বারবিকিউয়ের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে। পাশাপাশি পারফেক্ট সাইড ডিশ হিসেবে জায়গা করে নেয় কর্নব্রেড বা ভুট্টার রুটি। বারবিকিউ জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি কারণ হলো একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে রান্না করা যেত। যেকোনো উৎসবে সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে খাবার উপভোগ করা যায়। অঞ্চলভেদে বারবিকিউয়ের স্বাদে নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়। মেমফিস পরিচিত মিষ্টি টমেটো-ভিত্তিক সসে চুবানো ‘পুল্ড পর্ক-শোল্ডার’-এর জন্য- যা একা বা স্যান্ডউইচ হিসেবে খাওয়া হয়। নর্থ ক্যারোলাইনায় ভিনেগারে আস্ত শূকর ধোঁয়া দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। ক্যানসাস সিটির স্থানীয়রা শুকনো মসলা মাখিয়ে রান্না করা রিবস পছন্দ করে, আর টেক্সাসবাসী? তারা পছন্দ করে গরুর মাংস।

মজার ব্যাপার হলো, স্থানীয়রা তাদের অঞ্চলের রান্নার শৈলীকে এমনভাবে সমর্থন করে যা ফুটবলের অন্ধ ভক্তদের মধ্যে দেখা যায়। যেমন রেড সক্সের ভক্তের সামনে ইয়াঙ্কিদের নাম না তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ, তেমনি টেনিসির কারও সামনে টেক্সাসের গরুর মাংসের প্রশংসা না করাই ভালো। বারবিকিউ করার জন্য দামি মাংসের প্রয়োজন হয় না। ফলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে, যা তারা সাধারণত ভাজা ঢেঁড়স এবং মিষ্টি আলুর মতো সবজির সাথে খেত। ২০ শতকের প্রথমার্ধে গ্রামীণ দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক আফ্রিকান-আমেরিকান উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোতে স্থানান্তরিত হন এবং তারা যাওয়ার সময় সাথে করে তাদের রান্নার রেসিপিও নিয়ে যান। ১৯৫০-এর দশকের মধ্যে আমেরিকার প্রায় প্রতিটি শহরেই কৃষ্ণাঙ্গদের মালিকানাধীন বারবিকিউয়ের দোকান গড়ে ওঠে। ফ্রাইড চিকেন, কর্নব্রেড এবং হাস পাপির পাশাপাশি বারবিকিউ ‘সোল ফুড’ হিসেবে পরিচিতি পায়। আজও এই খাবারের সাথে আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যান্য দেশ তাদের নিজস্ব শৈলীতে বারবিকিউ তৈরি করে।
কোরিয়ান বারবিকিউতে গরুর বা শূকরের মাংসের পাতলা স্লাইস রান্না করে ভাতের সাথে পরিবেশন করা হয়। আর্জেন্টিনায় রয়েছে ‘আসাদো’ , যা মসলা ছাড়া ধোঁয়ামুক্ত গর্তে রান্না করা মাংস। আর অবশ্যই মঙ্গোলিয়ান বারবিকিউ রয়েছে, যা আসলে বারবিকিউও নয় এবং মঙ্গোলীয় উৎসেরও নয়—বরং এটি তাইওয়ানে উদ্ভাবিত এক ধরণের স্টার-ফ্রাই – তাওয়ায় সাঁতলানো খাবার।
রেড মিট এমনিতেই হৃদরোগ ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়, আর তা যদি বারবিকিউ বা সরাসরি কয়লার আগুনে পোড়ানো হয়, তবে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, উচ্চ তাপমাত্রায় রেড মিট গ্রিল বা বারবিকিউ করার সময় মূলত দুটি বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি হয় । এই দুটি উপাদান মাংসের গায়ে আটকে গিয়ে শরীরে প্রবেশ করে এবং মানুষের ডিএনএ পরিবর্তন করে পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয় ও বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে চিকিৎসকরা বারবিকিউ একদম বাদ দিতে বলেন না, বরং কিছু স্বাস্থ্যকর সতর্কতা মেনে মাঝেসাঝে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, লেবুর রস, ভিনেগার, টক দই, রসুন বা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ মশলা দিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট ম্যারিনেট করলে ক্ষতিকর পদার্থ প্রায় ৯০% পর্যন্ত কমে যায়। এছাড়া মাংসের অতিরিক্ত চর্বি কেটে ফেললে ধোঁয়া কম হয়। এছাড়া গ্রিল করার আগে মাংস সামান্য সেদ্ধ করে নিলে আগুনের সংস্পর্শে থাকার সময় কমে আসে।
তবে খেয়াল রাখতে হবে মাংসের যেসব অংশ পুড়ে একদম কালো বা কয়লার মতো অংশ যেন পেটে না যায়। অতিরিক্ত কড়া আঁচে না পুড়িয়ে কিছুটা দূরে রেখে মৃদু তাপে রান্না করা বরং ভালো। বারবিকিউ যদি ভালোবাসেন তবে রেড মিটের পরিবর্তে মুরগির মাংস, মাছ কিংবা মাশরুম ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন খাদ্য বিশারদরা।
তবে, যে দেশেই জন্ম হোক, সূর্য ডুবতে শুরু করলে, গ্রিলে কিছু মাংস চড়িয়ে দিন এবং আমেরিকান কাউবয় সং শুনতে শুনতে অতিথিদের সঙ্গে গল্প করুন। খুবই ক্লাসিক একটা ব্যাপার তাই না?
শাঁওলী সুমন




