একদিকে পেট্রোল পাম্পে কিলোমিটারজুড়ে ডিজেলের অপেক্ষা, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কবলে গ্রাম। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা। অথচ সংসদে এই বাস্তব সমস্যা নিয়ে কোনো আলাপ নেই। সেখানের আলাপে মনে হয়, সব ঠিকঠাক চলছে, আর তারা ব্যস্ত অন্যান্য আলাপে। যা জনগণের কোনো কাজে আসছে কি না, সেও এক প্রশ্ন ।

সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনগুলোতে বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে জ্বালানি মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল বেশ আত্মবিশ্বাসী। তার দাবি, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে। সংকটের জন্য তিনি দায়ী করেছেন সাধারণ মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে। কিন্তু এই বক্তব্যের সাথে মাঠপর্যায়ের তথ্যের অমিল আকাশ-পাতাল।
সরকারি তথ্যে ২ লাখ টনের ওপর ডিজেল মজুতের কথা বলা হলেও, ডিলার এবং ডিপোগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে ১০-১২ দিনের বেশি জ্বালানি নেই। সংসদে যখন পরিসংখ্যানের খেলা চলছে, তখন ঢাকার বাইরে কৃষকরা সেচের তেলের জন্য হাহাকার করছেন। সরকারের এই ‘ডিনায়াল মোড’ বা অস্বীকার করার প্রবণতা সংকটকে সমাধান করার বদলে বরং মানুষের মনে আস্থাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।
সরকার কেন ‘হোম অফিস’ বা অফিস সময় কমানোর মতো কার্যকর ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তগুলো নিতে দেরি করছে?
সরকার কি মনে করছে, যদি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো জ্বালানি সংকটের কথা স্বীকার করে এবং কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের (যেমন: ৩ দিন অফিস বা শপিংমল দুপুরেই বন্ধ) ঘোষণা দেয়, তবে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাবে? এই কাল্পনিক ‘ইমেজ’ ধরে রাখার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বাজি রাখা হচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা এবং লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলার সংকট। ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা মানেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা মেনে নেওয়া—যা বর্তমান সরকার এই রাজনৈতিক অস্থির সময়ে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছে।
যখন সংকট দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন সরকার কেবল ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ বা ‘ফুয়েল পাস’ প্রবর্তনের মতো ছোটখাটো প্রশাসনিক তদারকিতে ব্যস্ত। অথচ প্রয়োজন ছিল জরুরি অবস্থার মতো সাহসী পদক্ষেপ।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, শহরের বিলাসিতা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ঠিক রাখতে গ্রামের কৃষি খাে জ্বালানি সংকটে পড়ে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ। কৃষি না বা
ডিজেল সংকটের কারণে যদি সেচ পাম্প বন্ধ হয়, তবে ধান উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলশ্রুতিতে আগামী কয়েক মাসে খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংসদ এখন ব্যস্ত জুলাইয়ের গণভোট, সংবিধান সংশোধন কিংবা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের মতো দীর্ঘমেয়াদী এবং বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে। কিন্তু বর্তমানের ‘লাইফলাইন’ বা বাঁচার রসদ—জ্বালানি ও বিদ্যুৎ—নিয়ে কোনো জরুরি রোডম্যাপ নেই। কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সংস্কারের আলাপ অনেকটা তাসের ঘরের ওপর দালান বানানোর মতো।
বর্তমানে আমাদের সামনে প্রধান আলাপ হওয়া উচিত দুটি—জ্বালানি সংকট এবং জনস্বাস্থ্য। যখন কৃষি ও শিল্প উৎপাদন হুমকির মুখে, তখন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বা সংবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করাটা অনেকটা বিলাসিতা। দেশের মানুষের থালায় যদি ভাত না থাকে, আর কলকারখানায় যদি উৎপাদন না চলে, তবে কোনো রাজনৈতিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
সরকারকে সবার আগে সত্যটা স্বীকার করতে হবে। তথ্য লুকিয়ে রাখলে কালোবাজারি বাড়ে।
সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিলাসদ্রব্য আমদানি বন্ধ করে হলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য জ্বালানি আমদানির অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
নামমাত্র ১ ঘণ্টা অফিস কমিয়ে কোনো লাভ নেই। বড় শহরগুলোতে পূর্ণাঙ্গ ‘হোম অফিস’ চালু করা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও ব্যবসায়িক সময়সূচী কঠোরভাবে পুনর্বিন্যাস করা সময়ের দাবি।
একটি দেশের সরকার যখন সংকটের গভীরে না গিয়ে কেবল লক্ষণগুলো ঢাকার চেষ্টা করে, তখন সেই সংকট এক সময় ব্যাপক আকার ধারণ করে। সংসদে জ্বালানি নিয়ে শুধু গৎবাঁধা বিতর্ক নয়, বরং যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কৃষি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে যাওয়ার আগেই সরকারকে ‘সব ঠিক আছে’ ভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাস্তবতা হলো, কৃষি আর উৎপাদন না বাঁচলে কোনো রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত টিকবে না।
শাঁওলী সুমন
ছবি আলাপ নিউজ ও সময়ের আলোর সৌজন্যে



