Spread the love

কুড়িগ্রামের ক্ষুব্ধ কৃষকেরা ডিলারের গুদাম ভেঙে সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ায় যেন নড়েচড়ে বসেছেন সবাই। তদন্ত কমিটি হয়েছে,সেই তদন্তে ডিলার দোষী স্যবস্ত হচ্ছেন , এমনকি তিনজন মন্ত্রীকে দিয়ে আলাদা মন্ত্রিসভা কমিটিও করা হলো । কিন্ত প্রশ্ন হলো কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিব বেশ কিছুদিন থেকে নানা হাকঁডাক আর অনিয়ম হলে বরদাশত না করার ঘোসণা দেযা সত্বেও সার লুট হলো কেন ? কুড়িগ্রামে সার লুটের পর দিনাজপুরে অনিয়ম করে সার বিক্রী আর আজো রাজশাহী থেকে সারের সংকট এবং দাম বাড়ার খবর পাওয়া গেছে । বিশ্লেষকদের প্রশ্ন ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির দায়ে তবে শাস্তি হবে কার ?

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ খুব বেশি উচ্চবাচ্য না করলেও আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ১৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি সার মজুত আছে। তাহলে কী হচ্ছে?

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের গুদাম ভেঙে সারের বস্তা ছিনিয়ে নিয়েছেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করছে সরকার। সরকারি নথিতে সারের পর্যাপ্ত মজুত দেখানো হচ্ছে। অথচ মাঠপর্যায়ে সাধারণ কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। এতে প্রশ্ন উঠছে, গলদ কোথায়? সারের সরবরাহে নাকি বিতরণ ব্যবস্থায়? নাকি সার আছে শুধু কাগজে-কলমে? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম ও প্রশাসনিক গাফিলতি কাজ করছে।

কুড়িগ্রামের ঘটনাটিকেই যদি কেস স্টাডি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখানে চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। শিলখুড়ি ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী এখানে সারের মোট চাহিদা ১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন। কিন্তু সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। বিশেষ করে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৪৩৮ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৬৮ মেট্রিক টন।

অধিকাংশ পরিবেশকের মূল গুদাম ইউনিয়নের ভেতরে নেই। সেগুলো উপজেলা সদরে রাখা হয়েছে। এর ফলে সময়মতো সার ইউনিয়নে পৌঁছায় না। সার কোথায় বিক্রি হচ্ছে তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যায়।সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন বিক্রয়কেন্দ্র খোলা রাখার কথা। কিন্তু ডিলাররা নিয়মিত দোকান খোলেন না। কৃষকেরা দিনের পর দিন ঘুরেও সার পান না। ডিলাররা নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করছেন না। অতিরিক্ত লাভের আশায় তাঁরা সার বাইরে পাঠাচ্ছেন। পরে সেই সার খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে ।এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সার এক পরিবেশকের কাছ থেকে কেটে অন্য পরিবেশককে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সার বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও কমিশনের অভিযোগও উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। আগস্ট মাসের জন্য দেশে পর্যাপ্ত টিএসপি, ডিএপি ও ইউরিয়া সার মজুত আছে। কিন্তু সরকারি বরাদ্দ সত্ত্বেও ডিলাররা সময়মতো সার তুলছেন না। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগসহ প্রায় সর্বত্র বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম সার তোলা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু কৃষি কর্মকর্তার উদাসীনতা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিলারদের সঙ্গে অসাধু যোগসাজশের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।

এটি কোনো প্রকৃত উৎপাদন বা আমদানির ঘাটতি নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ সরবরাহ-চেইনের ত্রুটি ও দুর্বল তদারকি। ডিলারদের দোকানে সার না থাকলেও পাশের খোলাবাজারে চড়া দামে সার ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। এক পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলারশিপ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারের কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা।

এক. ডিলারদের সার উত্তোলনের জন্য কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেয়া

দুই. ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা

তিন. অসাধু ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করে শাস্তির ব্যবস্থা জরুরি

চার. সাব-ডিলারের বিকল্প হিসেবে সরাসরি ও নতুন বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

অনিয়ম যে হচ্ছে, বিষয়টি কিন্তু সরকারেরও জানা আছে। সচিবালয়ে জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, কিছু এলাকায় সার বিতরণে কিছুটা সমস্যা বা অনিয়ম দেখা দিয়েছে কিছু ডিলার তাঁদের বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন না। সরকার দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। তার বক্তব্য ধরেই প্রশ্ন করতে হয় কৃষি মন্ত্রনালয় তাহলে করছেটা কি ?

শাঁওলী সুমন