
বাড়িতে অতিথি এলে আমরা সবচেয়ে ভালো খাবার, তেল-ঝোল-ঝালে রসনা তৃপ্তিকর খাদ্য তৈরি করে পরিবেশন করি। খাবার টেবিল সাজাই আন্তরিকতা দিয়ে। অতিথি যেন বুঝতে পারেন তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হচ্ছে। তবে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতনতায় খাবারের অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মোগল খাবারের চেয়ে এখন আমরা চাই একটু পুষ্টি, একটু তৃপ্তি নিশ্চিত করতে। সেই একই আন্তরিকতা ছিল ব্রিকসের মেহমানদারিতেও। তেল-ঝোল-ঝালের বদলে একটু বেশি নজর দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যের দিকে। অতিথিদের একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর , তৃপ্তিকর ও রুচিশীল খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।

বিশ্বমঞ্চের অতিথিদের সামনে কীভাবে পুষ্টিকর, রুচিশীল এবং সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা যায় যেন তারই প্রতিযোগিতার হয়ে গেলো নয়াদিল্লিতে। শেফদের মধ্যে ছিল রান্নার কৌশল আর মুন্সিয়ানায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। দিল্লির শীর্ষস্থানীয় বিলাসবহুল হোটেল—তাজমহল, দ্য লিলা প্যালেস এবং দ্য ললিতের অভিজ্ঞ শেফরা ঐতিহ্য আর আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন এই খাদ্যতালিকায়।

অতিথিদের খাবারের একটি প্রধান উপাদান ছিল ‘মিলেট’ বা বাজরাভিত্তিক নানা পদ। মিলেট কেবল একটি শস্য নয়- প্রোটিন, ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও আয়রনে ভরপুর এক ‘সুপারফুড’। কুইনোয়া উপমা, রাগি ধোসা কিংবা মিলেট বিরিয়ানির মতো পদগুলো যেমন হজমে সহজ, তেমনি দীর্ঘক্ষণ শরীরে শক্তি জোগায়। ভারী খাবারের পাশাপাশি স্ন্যাক্স হিসেবেও রাখা হয়েছিল ওটস মিলেট কুকিজ ও হাতে তৈরি গ্র্যানোলা বার।

স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখার পাশাপাশি ভারতীয় ঐতিহ্যকেও সমান প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাজমহল হোটেল তাদের ‘ট্র্যাডিশন টু টেবিল’ মেনুতে কাশ্মীরের আখরোট, পুরোনো দিল্লির খাস্তা কচুরি, মহারাষ্ট্রের ভাকড়াবাড়ি, রাজস্থানের মিনি কচুরি, পশ্চিমবঙ্গের কুচো নিমকি এবং তামিলনাড়ুর মুরুক্কু। ৬টি অঞ্চলের রন্ধনশৈলী নিয়ে এক চমৎকার এতিহ্যিক প্যাকেজ।
তাজমহল হোটেলের শেফরা নিজেদের মায়েদের হাতের রেসিপি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ভারতের ৬টি ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বমূলক নোনতা পদ সাজিয়েছিলেন। কাশ্মীরের মসলাযুক্ত আখরোট- হিমালয় অঞ্চলের প্রশান্তি ও সমৃদ্ধ মসলা ঐতিহ্যের প্রতীক। এতে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। পুরোনো দিল্লির ময়দা কাজু ও খাস্তা কচুরি- মোগলাই ও উত্তর ভারতীয় স্ট্রিট ফুডের ঐতিহাসিক মিশ্রণ। সুস্বাদু শর্করা ও প্রোটিনের সংমিশ্রণ। মহারাষ্ট্রের ভাকড়াবাড়ি- পশ্চিম ভারতের ঝাল-মিষ্টি সংস্কৃতির সমাহার। তিল ও মশলার ব্যবহারে পুষ্টিকর ও মুখরোচক। রাজস্থানের মিনি কচুরি- মরুভূমির শুষ্ক জলবায়ুতে দীর্ঘস্থায়ী ও সুস্বাদু খাবারের ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। পশ্চিমবঙ্গের কুচো নিমকি- পূর্ব ভারতের পরিচিত মচমচে নোনতা খাবার। বাঙালি আতিথেয়তার প্রতীক। তামিলনাড়ুর মুরুক্কু- দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন চাল ও কলাইয়ের তৈরি কড়কড়ে পদ।

এদিকে, দ্য লিলা প্যালেস ভারতের জাতীয় ফুল ও ব্রিকস চিহ্নের আদলে হাতে তৈরি ‘ভোজ্য পদ্মফুল’ পরিবেশন করে। গোলাপি গোলাপ, জাফরান ও এলাচের নির্যাসে তৈরি এই অনন্য খাবারটি যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনই শরীর ও মনের জন্য ছিল প্রশান্তিদায়ক।
বিদেশি অতিথিরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে আহার উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য খাবারে ঝাল ও অতিরিক্ত মসলা এড়িয়ে তৈরি করা হয়েছিল সুষম ভারসাম্য। ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী গলৌটি কাবাব ও জাফরানি পনির রোলের পাশাপাশি স্থান পেয়েছিল জাপানি মিসো পেস্ট দিয়ে তৈরি বেগুন এবং অ্যাম্বার সসের কিডনি বিন। শেষপাতে ঐতিহ্যবাহী রসমলাই ও ল্যাটিন আমেরিকান কেকের মিশ্রণে তৈরি ‘রসমলাই ত্রেসলেচেস’ এবং শেষে সতেজতার জন্য ছিল কাশ্মীরি কাহওয়া ও দার্জিলিং চা।
সংস্কৃতি, স্বাদ ও স্বাস্থ্যের এই সমন্বয় দৃষ্টান্ত হতে পারে অতিথি আপ্যায়নে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কূটনীতি কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকের টেবিলে কিংবা যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সুনিপুণ বক্তব্যের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক রাজনীতির এক অন্যতম সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর অস্ত্র হলো আতিথেয়তার, রান্নারকূটনীতি




