খনা এক বিদুষী নারী। জ্যোতিষশাস্ত্রে নিপুণা ও বচন রচনায় পারদর্শী। ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর আবির্ভাবের অনুমান করা হয়। তখন ছিলো না কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ ছিল না, ছিল না আবহাওয়া অফিসের নিয়মিত বুলেটিন। অথচ বাংলার কৃষক জানতেন কখন বৃষ্টি হবে, আর কোন মাসে কোন ফসল বুনলে গোলা ভরবে ধানে। এই অসামান্য জ্ঞানের উৎস ছিলেন একজন বিদুষী নারী— খনা। লোকমুখে প্রচলিত তাঁর সেই ‘খনার বচন’ আজও কেবল গ্রামবাংলার সংস্কৃতি নয়, বরং আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
খনা সময়ের চেয়েও অগ্রগামী
আমরা যাকে ‘অ্যাগ্রো-মেটিওরোলজি’ বলছি, খনা তাঁর বচনের মাধ্যমে তার ভিত্তি গড়েছিলেন সেই সময়েই। মেঘের গতিপ্রকৃতি আর বাতাসের দিক দেখে তিনি বলে দিতে পারতেন আগামীর ফলন কেমন হবে।
“চৈত্র থরথর, বৈশাখে ঝড়-পাথর / জ্যৈষ্ঠতে তারা ফুটে / তবে জানবে বর্ষা বটে”
অর্থাৎ, চৈত্রের ঠান্ডা আর বৈশাখের শিলাবৃষ্টি যে একটি উর্বর বর্ষার ইঙ্গিত দেয়, এই পর্যবেক্ষণ আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের সাথেও মিলে যায়। আবার বৃষ্টির অভাবে খরা হওয়ার পূর্বাভাসও তিনি দিয়েছিলেন অবলীলায়: “দিনে জল রাতে তারা, সে বছর শুখোর ধারা”।
রোপণ কৌশলে যেন বিজ্ঞানের সাথে ছন্দবদ্ধ মিতালী
গাছ লাগানোর দূরত্ব এবং মাটির গভীরতা নিয়ে খনার বচনগুলো যেন একেকটি কৃষি প্রটোকল। কলা চাষের ক্ষেত্রে তাঁর উপদেশ:
“সাত হাতে তিন বিঘাতে / কলা লাগাবে মায়ে পুতে / কলা লাগিয়ে না কাটবে পাত / তাতেই কাপড় তাতেই ভাত”
কলাগাছের দূরত্ব কতটুকু হবে এবং পাতা না কাটার ফলে যে গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় না, এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি তিনি কত আগেই সহজ ছন্দে বুঝিয়ে গেছেন। শুধু কলা নয়, আম-কাঁঠালের সঠিক বৃদ্ধির জন্য ‘বিশ হাত’ দূরত্বের কথা বলে তিনি আধুনিক উদ্যানতত্ত্বের (ঐড়ৎঃরপঁষঃঁৎব) মূল তত্ত্বই উপস্থাপন করেছেন।
জৈব সার ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় খনা শিখিয়েছেন যে কৌশল
রাসায়নিক সারের কোনো নামগন্ধ তখন ছিল না। খনা শিখিয়েছিলেন মাটির গুণাগুণ বজায় রেখে কীভাবে ফলন বাড়ানো যায়।
যেমন, নারিকেল গাছে লবণ প্রয়োগের মাধ্যমে পটাশিয়ামের অভাব পূরণ করা। ফাল্গুনে শুকনো পাতা পুড়িয়ে বাঁশঝাড়ে ছাই দেওয়া, যা চমৎকার ফসফেট ও পটাশ সার হিসেবে কাজ করে।
বাংলার প্রথম নারী কৃষিবিজ্ঞানী খনা
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, খনা ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্রবধূ। তবে তাঁর মেধা একসময় তাঁর শ্বশুরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি কেবল ঘরকন্যা সামলানো নারী ছিলেন না, বরং কৃষিকে একটি সম্মানজনক পেশা এবং বিজ্ঞানের স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বচন আজও ভারত-বাংলাদেশজুড়ে ৯৭ শতাংশ কৃষকের কাছে পরিচিত।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের যখন ঘুম হারামের উপক্রম, তখন খনার বচনগুলো আমাদের শেখায় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলা। জৈব কৃষি বা ‘অরগানিক ফার্মিং’-এর জন্য খনার বচনগুলো হতে পারে এক নির্ভরযোগ্য গাইড। মাটি রক্ষা, পানির সঠিক ব্যবহার এবং কীটনাশকহীন চাষাবাদের যে আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে চলছে, এর শুরুটা বোধকরি খনার হাত ধরেই এসেছে।
খনার বচন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়।
মির্জা মোনালিসা


